ভোলার মনপুরা উপজেলায় ইলিশের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষায় সরকার ঘোষিত মার্চ-এপ্রিল দুই মাসব্যাপী মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় জেলেপাড়াগুলোতে নেমে এসেছে নীরবতা। নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো জেলে। ফলে ঈদকে সামনে রেখে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তারা ও তাদের পরিবার। বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময় দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর নির্ধারিত অভয়াশ্রম এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। এ সময় জেলেদের নদীতে নামা এবং জাল ফেলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মূলত ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতেই এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়।
মনপুরা উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার ২৪৩ জন। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন জেলে নিয়মিত নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। মার্চ ও এপ্রিল মাসে টানা দুই মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব জেলে কার্যত বেকার হয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের পরিবারগুলোও পড়েছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। সরেজমিনে দেখা গেছে, মনপুরার হাজীরহাট, সোনারচর, দাসেরহাটসহ বিভিন্ন জেলেপাড়ায় এখন ভিন্ন এক দৃশ্য। যেখানে সাধারণ সময়ে নদীতে মাছ ধরা আর নৌকার আনাগোনায় মুখর থাকে ঘাটগুলো, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা। নদীতে নেই জেলেদের ব্যস্ততা, ঘাটে পড়ে আছে জাল ও নৌকা। এদিকে সামনে আসন্ন ঈদুল ফিতর। সাধারণ মানুষ যখন ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও উদ্বেগ। অনেকের ঘরে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ নেই, আবার বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থাও নেই। ফলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। স্থানীয় কয়েকজন জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে কিছু চাল সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পরিবার-পরিজন নিয়ে টানা দুই মাস সংসার চালানো খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ঈদের আগে সন্তানদের নতুন পোশাক ও প্রয়োজনীয় খরচ জোগাতে না পারার চিন্তায় তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা উজ্জ্বল বনিক জানান, নিবন্ধিত জেলেদের তালিকা অনুযায়ী প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন জেলেকে দুই ধাপে মোট ৮০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হবে। প্রতিটি ধাপে ৪০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নদীতে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে, যাতে কেউ অবৈধভাবে মাছ ধরতে না পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া যাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে জেলে পরিবারগুলোর জীবনমানের দিকটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না হলে প্রতি বছর একই সময়ে মনপুরার হাজারো জেলে পরিবারকে মানবিক সংকটে পড়তে হবে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, ইলিশ রক্ষার পাশাপাশি জেলেদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি আরও কার্যকর ও মানবিক হয়ে উঠবে।