ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে, কোন ভালো উদ্যোগ আর সফলতার সাথে জড়িয়ে থাকে কোন স্নেহময়ী আর মমতাময়ী নারীর অবদান। ইতিহাস থেকেই জানা যায়, যে কৃষির উপর দাঁড়িয়ে আমরা মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছি সেই কৃষির সুচনা হয়েছিলো নারীর হাত ধরেই। এই গল্প আমাদের কমবেশী সকলেরই জানা। কোন পুরুষের সফলতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোন নারীরই অবদানের চিত্র সামনে এসে দাঁড়ায়। হতে পারে সেই নারী, স্নেহময়ী মা, স্ত্রী, বোন বা প্রেমিকা। তাইতো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন 'কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, শক্তি দিয়েছে প্রেরণা দিয়েছে বিজয় লক্ষী নারী'। প্রকৃতপক্ষে নারী সমাজ কখনও নিভৃতে আবার কখনও প্রক্যাশ্যে পরিবেশ, পরিবার, সমাজ, সংস্কৃতি সুরক্ষায় বিশেষ অবদান রেখে চললেও সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বেড়াজাল ভেদ করে আমরা নারীর সেই অবদানের স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রদানের সাহস রাখিনা। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন ও সুরক্ষা কার্যক্রমে নারীর অবদান ওতপোতভাবে জড়িত থাকলেও আমরা তা বিশেষভাবে খুঁজে দেখার চেষ্টা করিনা। আর এ কারণে নারীরা তাদের সৃজনশীল উদ্যোগগুলোর জন্য নুন্যতম স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায়না। সম্প্রতি নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নে এনায়েতপুর উরাও পাড়ার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের গৃহিত একটি উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। আকারে এই উদ্যোগটি খোলা চোখে দেখলে ছোট মনে হলেও বিদ্যমান জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সময়ে পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা সুরক্ষায় এর রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পল্লীতে প্রায় ৫০টি পরিবারের বাস। সকলেই দিনমজুর ও শিক্ষায় অনগ্রসর। একদিন অপরের বাড়িতে কাজে না গেলে তাদের পেটে খাবার জোটে না। এমন একটি অবস্থান থেকে পল্লীর ২০টি পরিবারের ২০জন নারী মিলে পরিবেশ সুরক্ষা এবং মাটির উর্বরতা রক্ষায় গ্রহণ করেছে এক অনন্য উদ্যোগ। এ সকল গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীরা ক্ষতিকর পলিথিন ও পলিথিন জাতীয় কাগজ ব্যবহারের পর বাহিরে না ফেলে নিজ নিজ বাড়িতে বস্তায় সংরক্ষণ এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে সেগুলো ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁরা নিজেরা এই কাজটি করছেন এবং গ্রামের অন্য নারীদের যত্রতত্র পলিথিন ফেলে পরিবেশ নষ্ট না করার জন্য উৎসাহিত করছেন। গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি বাড়ির সামনে বিশেষ ব্যবস্থায় একটি করে বস্তা টানিয়ে রাখা হয়েছে। এই বস্তার মধ্যেই তাঁরা অপচনশীল পলিথিন ও পলিথিন জাতীয় কাগজ জমা করছেন। যাতে যত্রতত্র এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরিবেশ, পানি ও মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট না করতে পারে। এ বিষয়ে উদ্যোক্তাদের কয়েকজন সকালী উরাও, আদরী উরাও, অঞ্জলী উরাও, মিলনী উরাওসহ আরো কয়েকজন এই প্রতিবেদককে জানান, যেহেতু পলিথিন ছাড়া এখন আমাদের চলে না। এমন কোন পরিবার নেই যেখানে প্রতিদিন বাজার থেকে ২/৪টা পলিথিন আসেনা। এগুলো আমরা ব্যবহার করে বাহিরে ফেলে দিতাম। এর ফলে গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়, পুকুরের পানিতে পড়ে পানি দুষিত হয় এবং আবাদী জমিতে মিশে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হয়। এই সমস্যাগুলো আমরা জানতে পারি স্থানীয় বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন বরেন্দ্রভূমি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা (বিএসডিও) আয়োজিত নারী-পুরুষ সমতা, জলবায়ু ন্যায্যতা ও অন্তর্ভূক্তি বিষয়ক সচেতনতামুলক সভায় যোগদানের মাধ্যমে। গ্রামে অনুষ্ঠিত এই সচেতনতামুলক সভা থেকে আমরা পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলদ্ধি করি এবং নিজ নিজ বাড়িতে পলিথিন সংগ্রহ করে তা ধ্বংস করার উদ্যোগ গ্রহণ করি। বর্তমানে আমরা ২০টি পরিবার বাড়ির উঠোনে বস্তা স্থাপন করেছি। এ সকল বস্তায় আমরা পলিথিন সংগ্রহ করছি এবং বস্তা ভরে গেলে সেগুলো ফাঁকা স্থানে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলছি। আমাদের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে আনা। এ বিষয়ে বিএসডিও’র উপজেলা কো-অর্ডিনেটর ময়না রানী জানান, সংস্থা সুইজারল্যান্ড, কানাডা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নওগাঁ জেলার ৩টি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে ৩০মাস মেয়াদী জেন্ডার ইকুয়ালিটি ট্রান্সফর্মস ক্লাইমেট অ্যাকশন (গেটকা) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের মুল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও তা মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নারী ও যুবদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু উদ্যোক্তা গঠনের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা। যাতে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত পরিস্থিতির সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে এবং জলবায়ু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।