বিনিয়োগ স্থবিরতার মাঝেও যন্ত্রপাতি আমদানিতে গতি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১২ মার্চ, ২০২৬, ০৮:১৫ এএম
বিনিয়োগ স্থবিরতার মাঝেও যন্ত্রপাতি আমদানিতে গতি

বাংলাদেশে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানির চিত্রে নতুন এক প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে- মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার প্রত্যাশা এবং নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ধীরে ধীরে গতি আসছে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানির জন্য ৪ হাজার ২৭৭ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি হয়েছে ১২১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে- আগের অর্থবছরের দুর্বল ভিত্তি, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানা সংস্কারের প্রয়োজন, এবং নির্বাচনের পর বিনিয়োগে নতুন আগ্রহ। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেগুলো পুনরায় সচল করতে যন্ত্রপাতি আমদানির প্রয়োজন হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনের পর নীতিগত ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হওয়ায় উদ্যোক্তারা স্থগিত রাখা বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছেন। ডলার সংকটও অনেকটা কেটে গেছে, ফলে এলসি খোলায় বড় বাধা নেই। তবে এলসি খোলার প্রবণতা বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে। একই সময়ে নিষ্পত্তির পরিমাণ ১৬ শতাংশ কমে ৯০৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাস্তব আমদানির গতি পুরোপুরি ফিরে আসেনি। শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের এলসি ২ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪৬৯ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে ভোগ্যপণ্যের এলসি বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। রমজান মাসকে ঘিরে রেখে চাল, ডাল, তেল, খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বাড়ায় এ প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও সমপ্রসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ সংকট এখনও বড় শিল্প স্থাপনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বেশিরভাগ মেশিনারি বিদ্যমান শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রযুক্তি হালনাগাদে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ এম. মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় নীতিগত ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই আস্থার ধারাবাহিকতা নির্ভর করবে সরকারের সংস্কার বাস্তবায়ন, জ্বালানি সরবরাহ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার ওপর। ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। ফলে এলসি খোলায় বড় সংকট নেই। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনও নিম্নমুখী। ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার (১৬-১৭ শতাংশ) ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি খাত দেশের জিডিপিতে ৭৮ থেকে ৮৬ শতাংশ অবদান রাখে এবং কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। অথচ সামপ্রতিক সময়ে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, সক্ষমতা হারানোর কারণগুলো বহুমুখী। উচ্চ সুদহার ঋণ গ্রহণকে অসম্ভব করে তুলেছে। জ্বালানির সংকট উৎপাদন ব্যাহত করছে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাড়িয়েছে। ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ১৭৪ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে বিনিয়োগ চাহিদা বাড়লে রিজার্ভ বৃদ্ধির এ ধারা ধরে রাখা যাবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হলেও একে কার্যকর ফলাফলে রূপ দিতে হলে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে অবদান রাখতে পারে, তবে এর জন্য প্রয়োজন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে