ইরানের হামলায় জ্বলছে তেলের ট্যাংকার, তেলের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ১২ মার্চ, ২০২৬, ১১:২১ এএম | প্রকাশ: ১২ মার্চ, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
ইরানের হামলায় জ্বলছে তেলের ট্যাংকার, তেলের বিশ্ববাজারে অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরাকের জলসীমায় জ্বালানিবাহী দুটি তেলের ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বকে তেলের ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের জন্য প্রস্তুত থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আরও বেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রায় দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সংঘাত দ্রুতই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলার কারণে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের জলসীমায় থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরক ভর্তি নৌকা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে একটি জাহাজের অন্তত এক ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। এর আগেও পারস্য উপসাগরে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু আঘাত হানার ঘটনা নিশ্চিত করেছেন সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ও বন্দর কর্মকর্তারা।

একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। দেশটির সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, “অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন। তেলের মূল্য নির্ভর করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর, আর সেই নিরাপত্তা আপনারাই অস্থিতিশীল করেছেন।”

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরাকের মতো দেশগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। কারণ বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থাকলেও তা পরিবহনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারেও পড়েছে। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ১৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রীর একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর দাম আবার দ্রুত বেড়ে প্রায় ৯০ ডলারে পৌঁছে যায়। পরে হোয়াইট হাউস সেই তথ্য অস্বীকার করলেও বাজারে অস্থিরতা থেকেই যায়।

এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর কৌশলগত মজুত থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭০–এর দশকের পর এটিই হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট মোকাবিলার চেষ্টা।

আইজি গ্রুপের জ্বালানি বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বলেন, “তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের লাগাম টেনে ধরতে আইইএ যে কৌশলগত মজুত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, ইরানের প্রতিক্রিয়া সেটির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলেই মনে হচ্ছে।”

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার কেন্টাকিতে এক সমাবেশে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আগেভাগেই সরে আসতে চাই না। আমরা কাজটা শেষ করতে চাই।”

তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলতে থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ০ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।

জাতিসংঘের শিশু তহবিল জানিয়েছে, চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে ১১০০–এর বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। এতে যুদ্ধের মানবিক সংকটও দ্রুত গভীর হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে