নির্বাচিত নতুন সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারিতেও অব্যাহত মব সন্ত্রাস

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৪ এএম
নির্বাচিত নতুন সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারিতেও অব্যাহত মব সন্ত্রাস

দেশে নির্বাচিত নতুন সরকার এলেও মব সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ঘোষণা করা হলেও বন্ধ হয়নি তা। মব সন্ত্রাস থেকে সাধারণ মানুষ রেহাই পাচ্ছে না। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে দেশে মব সন্ত্রাসে ৩০৮ জন নিহত হয়েছে। ওসব বেশির ভাগ ঘটনারই তদন্তে অগ্রগতি নেই। এখনো গ্রেপ্তার হয়নি মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হামলা, হত্যা, আগুনের ঘটনায় জড়িত বেশির ভাগ অপরাধী। মূলত ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশে মব সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে। এর কারণ তৎকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষমতাসীনের আনুকূল্যেও তখন আইন হাতে তুলে নেয়ার ঘটনা বেড়েছে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত শত্রুতা ও উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়ে প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে আহত করা কিংবা হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে মব সন্ত্রাস অনেকাংশে কমে এলেও এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। তবে নির্বাচিত নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থান নিয়ে মবের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবাধিকার সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে দেশে মব সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটে। তখন ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ এাঁকে প্রেসার গ্রুপ বলে আস্কারা দেন। ফলে দেশে উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর সরকার তা বন্ধ করতে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। তখন কোনো পদ থেকে কাউকে জোর করে নামিয়ে দেয়াসহ নানাভাবে মবের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। যে কারণে দেশে মব কেন্দ্রিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বর্তমানে মব সন্ত্রাস কিছুটা কমলেও নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও গত ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে মবের শিকার হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নবনির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। 

সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব আসার পর প্রশাসনের সক্রিয়তা বাড়ানো হচ্ছে। আর দায়িত্ব নেয়ার পর শিগগির সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মব কালচারের দিন শেষ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসে ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের ঘটনায় ১২৮ জনের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মৃত্যু হয় ৫ মাসে ৯৬ জনের, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয় আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। তাছাড়া সংখ্যালঘুদের ওপর ২১১টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। ওসব ঘটনায় ৪৮৭টি বাসা-বাড়িতে হামলা চালানো হয়, আগুন দেয়া হয় ৮৮টি বাড়িতে। সংখ্যালঘুদের ১১৩টি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। একই সঙ্গে ৪৭টি মন্দির-মঠ ও ১৯৪টি প্রতিমা ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওসব ঘটনায় ৭৮ জন আহত ও পাঁচজন নিহত হয়। 

সূত্র আরো জানায়, অন্তর্ববর্তীকালীন সরকারের সময়ে সারা দেশে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে মব সন্ত্রাস চালানো হয়। তাতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা হতাহত হয়। তাতে অনেকের মধ্যে আতঙ্ক ও মানসিক চাপদেখা দেয়। পুলিশের ওপর মব সন্ত্রাস, হামলা, হেনস্তারর ঘটনায় অনেক মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ৭০টি ছিল বড় ধরনের হামলার ঘটনা। এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪টি, নভেম্বরে ৪৯টি, ডিসেম্বরে ৪৩টি মামলা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও অনেক হামলার ঘটনা ঘটে। তবে ওসব ঘটনায় দায়ের করা বেশির ভাগ আসামি সাবেক সরকারের সময় গ্রেফতারর হয়নি। এমনকি অভিযুক্ত অনেক অপরাধীকে সরকারের নানা চাপের কারণে গ্রেফতার করা যায়নি।

এদিকে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, দেশে মব বা গণপিটুনির মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে ছিল পরিকল্পিত উসকানি, সরকারের সহযোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় কিছু ব্যক্তির ইন্ধন। পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং সরকারের উদাসীনতা ও কোনো পদক্ষেপ নিতে অনীহার কারণে গণপিটুনির প্রবণতা বাড়ে। যদিও মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে একজন নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা আইনের দৃষ্টিতে চরম অপরাধ। যারা এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজে মব ভায়োলেন্স চলেছে। এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ জানান, র‌্যাবের প্রতিটি সদস্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে দিচ্ছে। এখন কেউ মব সন্ত্রাস ঘটনানোর চেষ্টা করলেই র‌্যাব তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হয়েছে।  

সার্বিক বিষয়ে বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, মব কালচার কোনোভাবেই এগোতে দেয়া হবে না। দেশে মব কালচার বা দলবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মব সংস্কৃতি বাংলাদেশে কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এটি নির্মূল করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে