পূর্বাঞ্চল রেলপথে ঈদে যাত্রীর সামাল দিতে ট্রেনে যোগ করা হবে বিপুলসংখ্যক বাড়তি বগি। কারণ ঈদযাত্রার কয়েকদিন আগে ও পরে অন্তত ১০ গুণ বেড়ে যায় যাত্রী চাহিদা। আর ওই চাপ সামাল দিতে বাড়তি ট্রেন ও কোচ সংযোজন প্রয়োজন হয়। সেজন্য প্রতি বছরই রেলওয়ের সেরকম উদ্যোগ থাকে। এবারো তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। যদিও স্বাভাবিক সময়ে অনেক ট্রেনই স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশনের চেয়ে কম বগি নিয়ে চলাচল করে। বাড়তি কোচ অনেক ক্ষেত্রে ওই স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশনকে পূর্ণ হবে। আবার অনেক ট্রেনে স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশনের চেয়েও বেশি কোচ যুক্ত হবে। এভাবেই ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কোচ সংযোজন এবং প্রতিটি ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাতায়াতের টিকিট বিক্রির পরিকল্পনার মাধ্যমে যাত্রীর সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতিদিন গড়ে দেড় লাখ টিকিট ইস্যু করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মধ্যবর্তী স্টেশন, বেসরকারি পরিচালনাধীন ট্রেনসহ ওই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ। আর ঈদযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ঘরমুখো মানুষের অনেকেই বেছে নেন ট্রেন। সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বাহন হিসেবে ট্রেনের চাহিদা ব্যাপক। তাই ঈদের সময় প্রতিবারই কয়েক গুণ বাড়তি যাত্রীর চাপ সামলাতে রেলওয়ে হিমশিম খেতে হয়। যদিও প্রতি বছর ঈদে রেলে যাত্রীচাপ বাড়ছে। কিন্তু রেলওয়ে এখনো ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি।
সূত্র জানায়, রেলওয়ে ওয়ার্কশপগুলোতে ঈদ সামনে রেখে অন্তত তিন মাস আগেই শুরু হয় বগি মেরামত কার্যক্রম। ঈদ সামনে রেখে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে বিভিন্ন ট্রেনের ১০৫টি কোচ মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়। তার মধ্যে ৩ মার্চ পর্যন্ত ৮২টি কোচ অপারেটিং বিভাগকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকিগুলোও শিগগিরই বুঝিয়ে দেয়া হবে। মূলত রেলওয়ের মেকানিক্যাল কর্তৃপক্ষের প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিনটির বেশি কোচ মেরামত করার সক্ষমতা নেই। একইভাবে এবারের ঈদে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েও ১০০টি কোচ মেরামত করে ঘাটতি মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তার মধ্যে ৫৪টি ব্রড গেজ ও ৪৬টি মিটার গেজ কোচ। মূলত ঈদের আগের ও ঈদ-পরবর্তী তিনদিন যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোতে টিকিটের চাহিদা বেশি থাকায় ওই সময়ের জন্য কোচ সংযোজন করে স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন পূর্ণ করতে চায় রেলওয়ে। আসন্ন ঈদ যাত্রায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে সংযোজন করা হবে সর্বোচ্চ পরিমাণ বাড়তি বাড়তি। তাছাড়া একই রুটের তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর গোধূলি এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের বিজয় এক্সপ্রেস, চট্টগ্রাম-চাঁদপুর রুটের মেঘনা এক্সপ্রেস ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের পর্যটক ও কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনে সর্বনিম্ন একটি থেকে সর্বোচ্চ তিনটি পর্যন্ত বাড়তি কোচ সংযোজন করা হচ্ছে। আর ১৬ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ট্রেনগুলোতে স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশনের অতিরিক্ত ওসব বগি বাড়তি যাত্রী পরিবহন করবে।
সূত্র আরো জানায়, পূর্বাঞ্চল রেলে প্রতিদিন ১১৯টি লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ৭০-৭৫টির বেশি ইঞ্জিন সরবরাহ দিতে পারে না যান্ত্রিক বিভাগ। কিছুদিন ধরে ৭০-৭২টি করে ইঞ্জিন সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। যার কারণে কানেক্টিং ইঞ্জিন দিয়ে ফিরতি ট্রেন পরিচালনা, শিডিউল পিছিয়ে ট্রেন পরিচালনা এমনকি প্রতিদিন কম গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রা বাতিলের মাধ্যমে সার্ভিস পরিচালনা করছে রেলওয়ে। সমপ্রতি রেলের ইঞ্জিন সংকটের মধ্যেই প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি ইঞ্জিন যাত্রার মুহূর্তে কিংবা পথিমধ্যে বিকল হচ্ছে। ওই কারণে ঈদযাত্রা নিরবচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত সরবরাহের পাশাপাশি আরো ১০-১২টি ইঞ্জিন সরবরাহের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আর ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরই পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের চাহিদামতো কোচ মেরামতের কাজ করা হয়। এবার ১০৫টির মতো বগি মেরামতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল থাকায় চাইলেও এর বেশি কোচ মেরামত করে ট্রেনে সংযোজনের সুযোগ নেই। বর্তমানে রেলের শত শত কোচ ওয়ার্কশপে অকেজো পড়ে রয়েছে। শুধু জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে মেরামত করা সম্ভব হয় না। পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে দুটি কোচ মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে। ওই ওয়ার্কশপে ২ হাজার ২৫৫ জন জনবলের মঞ্জুরি থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ৭১০ জন। সংকট মোকাবেলায় ১৫০ জন অস্থায়ী জনবল দিয়ে কোচ মেরামতের কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এদিকে রেলের পরিবহন বিভাগের মতে, ঈদের সময় টিকিটের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে গেলেও যান্ত্রিক বিভাগের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাওয়া যায় না। রেলওয়ে বগি এবং ইঞ্জিন ঘাটতি নিয়েই ট্রেন পরিচালনা করে। একটি কোচ নষ্ট হয়ে গেলে মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে দিনের পর দিন আটকে থাকে। প্রতিটি ট্রেনের জন্য কম্পোজিশনের ২৫ শতাংশ স্পেয়ার থাকার কথা থাকলেও তা মানা হয় না। ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছর বাড়তি কোচ সংযোজনের কথা বলা হলেও মূলত ঘাটতি কোচগুলো সমন্বয় করা হয়।
অন্যদিকে রেলের বিপুল পরিমাণ নষ্ট বগি ও ইঞ্জিন মেরামতে অগ্রগতির বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর জানান, নানা সংকটের কারণে পর্যাপ্ত কোচ-ইঞ্জিন মেরামত সম্ভব হয় না। তারপরও ঈদ সামনে রেখে বিশেষ উদ্যোগে কোচ ও ইঞ্জিন মেরামত করা হচ্ছে। প্রতিবারের মতোই ১০০টির বেশি কোচ সংযোজন করে ঈদের যাত্রী চাহিদা মেটাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সংকটে থাকা বহরে ১০-১২টি ইঞ্জিনও ঈদের আগে সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান জানান, ঈদ সামনে রেখে প্রতি বছরই স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনা করা হয়। এবার নির্ধারিত কোচ ছাড়াও প্রায় সব ট্রেনেই বাড়তি কোচ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন আমদানি করা কোচ দিয়ে নতুন রেক তৈরি করে প্রতিস্থাপিত রেকগুলো একাধিক পুরনো আন্তঃনগর ট্রেনে দেয়া হচ্ছে। তাতে আসন্ন ঈদে যাত্রীরা আগের চেয়েও স্বস্তিতে ভ্রমণ করতে পারবে।