প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য যখন একসাথে ধরা দেয়, তখন তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত শিল্পকর্ম। ঠিক তেমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলছে কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ সড়কের নলডাংগা ইউনিয়নের একটি সড়কে, যা স্থানীয়দের কাছে প্যারিস রোড নামে পরিচিত রয়েছে। বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেতের মাঝ দিয়ে সোজা চলে যাওয়া এই সড়ক, আর তার দুই পাশে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ, সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নের জগৎ, যা প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করছে হাজারো ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে। ঝিনাইদহ নলডাঙ্গা ইউনিয়নের এই সড়কটি প্রায় ২ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তত। রাস্তার দুই পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের সমারোহ, ধানক্ষেতের ঢেউ আর তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ নারিকেল গাছের সারি। প্রকৃতির এই সুনিপুণ সাজসজ্জা দেখে মনে হবে যেন কোনো শিল্পীর নিখুঁত আঁচড়ে তৈরি একটি চিত্রপট। সকালে কোমল আলো, দুপুরে ঝলমলে রোদ আর বিকেলে সোনালি আভা, দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এই সড়কের রূপ বদলে যায়, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে বারবার।সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে ঈদ,দূর্গাপুজা, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন দিবসে এখানে দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম হয়। এছাড়া প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে মানুষ ছুটে আসছেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। অনেকেই মোবাইল ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি করছেন এই অনন্য মুহূতর্ গুলো।
যদিও এখানে এখনো স্থায়ীভাবে কোনো রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকান গড়ে ওঠেনি, তবুও দর্শনার্থীদের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বসতে দেখা যায়। চটপটি, ফুচকা, আইসক্রিম থেকে শুরু করে বিভিন্ন হালকা খাবার পাওয়া যায় এসব অস্থায়ী স্টলে, যা দর্শনার্থীদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সড়কটি একসময় ছিল সাধারণ একটি গ্রামীন রাস্তা। তবে সময়ের সাথে সাথে এর সৌন্দর্য ধীরে ধীরে মানুষের নজর কাড়তে শুরু করে। বর্তমানে এটি একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটে রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম রসূল বলেন, এই সড়কটি এখন কোলাহলমুক্ত একটি প্রাকৃতিক বিনোদন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। যদি সরকারি উদ্যোগে এটিকে আরও উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।দূর-দূরান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসছেন। খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে আসা ফজলুর রহমান বলেন, অনেকের মুখে এই জায়গার কথা শুনেছি। তাই নিজের চোখে দেখতে এলাম। সত্যিই অসাধারণ! এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের দেশে আছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।এলাকার খড়াশুনি গ্রামের বাসিন্দা ইকরামুল ইসলাম বলেন, এই সড়ক আমাদের গর্ব। আমরা চাই সরকারি ভাবে এর রক্ষণাবেক্ষণ করা হোক। পাশাপাশি নতুন করে নারিকেল গাছ ও তালগাছ রোপণ করলে সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
স্থানীয়রা বলছেন ১৯৯৩ সালে তৎকালীন নলডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দীন এই সড়কের পাশে প্রায় ২৫০০টি নারিকেল গাছ রোপণ করেছিলেন। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নানা কারণে বর্তমানে প্রায় ৭০০টি গাছ টিকে আছে। সেই গাছগুলিই আজকের এই অপরূপ সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ, নির্মল বাতাস এবং সবুজের সমারোহ, সব মিলিয়ে প্যারিস রোড এখন শুধু একটি সড়ক নয়, এটি হয়ে উঠেছে প্রকৃতি প্রেমিদের জন্য এক শাস্তির ঠিকানা। সঠিক পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে এটি ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।সবুজের এই স্বপ্নিল পথ যেন প্রতিনিয়ত আহবান জানাচ্ছে, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে কিছু সময়ের জন্য হলেও প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যেতে।