পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দের প্রস্তুতির মুহূর্তে এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন খুলনার পাইকগাছায় কাশিমনগর বাজারের মানুষ। একটি ভ্যানে করে এসে দুই ব্যক্তি ৮০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধকে পশু বিক্রির হাটের জায়গায় রেখে চলে যায়। সেই থেকে গত এক মাস ধরে এখানে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন নাম-পরিচয়হীন এই অসহায় বৃদ্ধ! গুমরে কাঁদছে মানবিকতা। সরেজমিনে কাশিমনগর বাজারে গিয়ে দেখা যায় এক করুণ দৃশ্য। কপোতাক্ষ নদের তীরে খোলা জায়গায় পড়ে আছেন শীর্ণকায় এই বৃদ্ধ। পরনে একটি শার্ট ও হাফপ্যান্ট। শরীরের ওপর মশা মাছি ভনভন করছে, দীর্ঘদিনের অযত্ন আর মলমূত্রের দুর্গন্ধে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ পরিচয় জানতে চাইলে তিনি কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন; মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। বয়সের ভার আর শারীরিক অসুস্থতায় তার বাকশক্তি আজ রুদ্ধ। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের উদ্বেগের সাথে বাজারের এক চা দোকানি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, "ভ্যানে করে দুই জন লোক তাকে এখানে বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমরা ভাবলাম হয়তো কেউ আত্মীয়র অপেক্ষায় আছে। কিন্তু ঘণ্টা পার হয়ে দিন গেল, তারা আর ফিরল না। সেই থেকে লোকটা এখানেই পড়ে আছে।" স্থানীয় সাংবাদিক জিএম মোস্তাক আহমেদ বলেন, "আমরা সাধ্যমতো তাকে খাবার দিচ্ছি, শুধু খাবার হলে চলে না। তার শরীর পরিষ্কার করা বা চিকিৎসা দেওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। এভাবে পড়ে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। বাজার করতে আসা সাধারণ মানুষের চোখেমুখেও এখন বিষণ্ণতা। নুরুল আমিন নামে এক পথচারী ক্ষোভের সাথে বলেন, "যাঁরা এই বৃদ্ধকে এমনভাবে ফেলে গেছেন, তারা তো মানুষ নামের কলঙ্ক। সিসিটিভি ফুটেজ বা অন্য কোনোভাবে তাঁদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা উচিত।" তবে এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সরকারি দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অনাথ কুমার বিশ্বাস বলেন, বিষয়টি জানিনা, এইমাত্র অবগত হলাম। আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করব। সুধীজনরা জানান, এই মুহূর্তে ওই বৃদ্ধের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি সরকারি বৃদ্ধাশ্রম বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয় এবং সুচিকিৎসা প্রয়োজন। একটি মানবিক আবেদন-আমরা কি এতটাই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি যে নিজের জন্মদাতা সমতুল্য একজন মানুষকে এভাবে পশুর মতো ত্যাগ করতে পারি? আজ এই বৃদ্ধ হয়তো কথা বলতে পারছেন না, কিন্তু তার চোখের চাহনি যেন পুরো সমাজের বিবেককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে আকুল আবেদন-অতিদ্রুত এই বৃদ্ধকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক এবং তার শেষ জীবনের দিনগুলো যেন অন্তত একটু মর্যাদার সাথে কাটে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একইসাথে, এই অমানবিক কাজের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। মানবতা যেন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে, রক্ত-মাংসের মানুষের কাজে ফুটে ওঠে-পাইকগাছাবাসী এখন সেই প্রতীক্ষায়!