“বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তর: প্রেক্ষিত ন্যায্যতা ও অর্থায়ন” শীর্ষক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত

প্রেস বিজ্ঞপ্তি | প্রকাশ: ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
“বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তর: প্রেক্ষিত ন্যায্যতা ও অর্থায়ন” শীর্ষক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে এসে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং ফসিল ফুয়েল ট্রিটি ইনিশিয়েটিভ-এর যৌথ উদ্যোগে “Transitioning Away from Fossil Fuels in Bangladesh: Justice and Finance Perspectives” (বাংলাদেশের জীবাশ্ম জ্বালানি রূপান্তর: প্রেক্ষিত ন্যায্যতা ও অর্থায়ন) শীর্ষক এক পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধরা’র সহ-আহবায়ক এম. এস. সিদ্দিকী এর সভাপতিত্বে সভার প্রেক্ষাপট ও সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন ধরা’র সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং ‘জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়সমূহ’ নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ-এর গবেষণা প্রধান মো. ইকবাল ফারুক। প্রেক্ষাপট ও সূচনা বক্তব্যে শরীফ জামিল বলেন, শুধুমাত্র ফসিল ফুয়েল থেকে বের হওয়ার রোডম্যাপ তৈরি করলেই যথেষ্ট নয়। এর সাথে জলবায়ু অর্থায়ন ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমান কার্বন মার্কেট ও কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাগুলো উন্নত দেশসমূহকে দূষণ চালিয়ে যাওয়ার পরোক্ষ বৈধতা দেয়। তাই ফজিল ফুয়েল থেকে বেরিয়ে আসার রোডম্যাপ তৈরির পাশাপাশি জলবায়ু অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ থাকা জরুরি। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন ও জীবাশ্ব জ্বালানি বিস্তারের নেতিবাচক অভিঘাতে কৃষক, জেলে, নারীসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠি অভাবনিয় দূর্দশার মধ্যে নিপাতিত। কাজেই জলবায়ু অর্থায়ন ও জীবাশ্ম জালানি থেকে বেরিয়ে আসা বাংলাদেশের জন্য অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত আলোচনায় জ্বালানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত তুলে ধরেন: বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন “বাংলাদেশে জ্বালানি ট্রানজিশন কেবল জলবায়ু নয়, আমাদের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত; কিন্তু নীতিনির্ধারণের জায়গায় সেই দূরদর্শী চিন্তার ঘাটতি স্পষ্ট। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপুল আমদানি নির্ভরতা এবং শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ট্রানজিশনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। সোলার খাতে ঘোষিত কম শুল্ক বাস্তবে অতিমূল্যায়নের কারণে অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করছে। শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, ন্যায্য নীতি এবং সহজ অর্থায়ন ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই রূপান্তর অর্জন সম্ভব নয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের ফলে বাংলাদেশ ক্রমেই এলএনজি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করছে। এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় ও ভর্তুকির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে তা আরও সাশ্রয়ী ও টেকসই হতে পারত। বিদেশি প্রভাবের কারণে দেশের জ্বালানি পরিকল্পনায় জাতীয় সক্ষমতা যথাযথভাবে গড়ে ওঠেনি এবং এর ফলে বাংলাদেশ ‘লক-ইন’ পরিস্থিতিতে পড়েছে। তারা সোলার রুফটপ ব্যবস্থায় নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবজনিত আস্থার সংকট দূর করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি এলএনজি আমদানিনির্ভর নতুন অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করা, স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং ন্যায্য ও অংশগ্রহণমূলক জ্বালানি নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (CPRD)-এর প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন “বাংলাদেশে জাস্ট ট্রানজিশন শুধু ফসিল ফুয়েল থেকে বের হওয়া নয়, বরং অ্যাডাপ্টেশন, কর্মসংস্থান এবং ন্যায্যতার প্রশ্নের সাথেও গভীরভাবে যুক্ত । কিন্তু গ্লোবাল আলোচনাকে আমরা এখনো কার্যকরভাবে জাতীয় নীতিতে রূপ দিতে পারিনি। আমাদের এনডিসি, ন্যাপ ও এলটি-লেডস-এ স্পষ্ট রোডম্যাপ দরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণে বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরি না হলে জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই ডিমান্ড ও সাপ্লাই উভয় দিক থেকেই সমন্বিত, কাঠামোগত এবং ন্যায়ভিত্তিক ট্রানজিশনের জন্য এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।” বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ড. কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন “নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ বিদ্যমান আইনি বাধাগুলো এখনো দূর করা হয়নি। সেচ পাম্পের মতো সহজ ক্ষেত্রেও ভূমি ব্যবহার ও মালিকানার জটিলতা সমাধানে কার্যকর নীতি ও স্পষ্ট আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান বহু বিচ্ছিন্ন আইন একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় জ্বালানি ট্রানজিশন বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই একটি সমন্বিত ‘মাদার ল’ বা নন-অবস্টাকল ক্লজসহ শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়ন ছাড়া গ্রিন এনার্জিতে অগ্রগতি সম্ভব নয়।” অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর ম্যানেজার (জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন) আবুল কালাম আজাদ বলেন “জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সমর্থন এবং বাস্তবতা ইতোমধ্যেই আমাদের পক্ষেই আছে; কেবল মঞ্চটি এখনো ফসিল ফুয়েল লবির দখলে। এখন আমাদের প্রধান কাজ হলো সেই মঞ্চ দখল করা, সক্রিয় উদ্যোগ, নীতিগত চ্যালেঞ্জ এবং সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ট্রানজিশন হবে নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী, তাই আমাদের ব্যর্থতা চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান তৈরি করা জরুরি। বৈশ্বিক প্রবণতা স্পষ্ট, নবায়নযোগ্য জ্বালানিই ভবিষ্যৎ, এখন নিশ্চিত করতে হবে এই রূপান্তর যেন ন্যায়ভিত্তিক হয় এবং সকল মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়।” ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (IEEFA)-এর লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন “বর্তমানে বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানির ৬২ শতাংশের বেশি আমদানিনির্ভর, ফলে বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫৫,৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এলএনজি ও আমদানি নির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই বড় চাপ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত ও কাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। একইসাথে বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস কমানো, সাবসিডির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নীতিনির্ধারণে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। এখনই সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।” সভায় রিভার বাংলা’র সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, ব্রাইটার্স-এর ফারিহা অমি, ইউথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস-এর সোহানুর রহমান, ইউক্যান (YOUCAN)-এর যুধিষ্ঠির চন্দ্র বিশ্বাস, ওএবি ফাউন্ডেশনের আসাদুজ্জামান তুহিন, ৩৫০ ডট ওআরজি-এর আমানুল্লাহ পরাগ জিএলটিএস এর শামস খান, রিভারাইন পিপল-এর এফ এম আনোয়ার হোসেন, ইআরডিএ-এর মনির হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোহাম্মদ আলী, ইয়াশ এর ইয়ার খান সেতু, ওসিআরইসি (OCREC)-এর আবু সাদাত মো. সায়েম, বিএমটিসি-এর মাশফিকুল হাসান টনি, আরডিএফ-এর সৈয়দ মঞ্জিল আজম, কালের কণ্ঠ-এর নিখিল চন্দ্র ভদ্র, এজেন্স ফ্রান্স-প্রেস (AFP)-এর ইয়ামিন সাজিদ, চ্যানেল ওয়ান-এর হাবিবুর রহমান, গর্জন সমাজকল্যান সংস্থা এর ফারজান উর্মি, ক্লাইমেট ফ্রন্টায়ার-এর যুবায়ের ইসলাম, কসমস- এর মেহনাজ মালা এবং ধরা’র সানজিদা রহমান, মামুন কবির সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আয়োজক সংগঠনগুলো আশা প্রকাশ করে যে, এই পরামর্শ সভার সুপারিশগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে