৩ বছরেও চালু হয়নি রাজশাহী শিশু হাসপাতাল, চুরি হচ্ছে জিনিসপত্র

এম এম মামুন; রাজশাহী | প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:১৬ এএম
৩ বছরেও চালু হয়নি রাজশাহী শিশু হাসপাতাল, চুরি হচ্ছে জিনিসপত্র
রাজশাহীতে প্রায় তিন বছর আগে নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি ২০০ শয্যার রাজশাহী সরকারি শিশু হাসপাতাল। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এই হাসপাতালটি অচল পড়ে আছে। হাসপাতালটি অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। চুরি হয়ে যাচ্ছে জিনিসপত্র।চারতলাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) শয্যা রয়েছে ৫২টি। এ ছাড়া ৯৬টি সাধারণ শয্যাসহ মোট ২০০ শয্যা রয়েছে। ভবনটি হস্তান্তরের জন্য করেক বার চিঠি দেওয়া হয়। এরপর চিঠি দিলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি বুঝে নিচ্ছে না। রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর রেল ক্রসিংয়ের দক্ষিণে লক্ষ্মীপুর কড়াইতলা টিবিপুকুর এলাকায় দিঘির পাড়ে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নবনির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। ভবন নির্মাণকাজের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদার নিজের লোক দিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে হাসপাতাল ভবনটি পাহারা দিচ্ছেন। তারপরও চুরি হয়ে যাচ্ছে শিশু হাসপাতালটির সরঞ্জাম। ঠিকাদার বারবার চিঠি দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নবনির্মিত শিশু হাসপাতালটি বুঝে নিচ্ছে না। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিচ্ছে শত শত শিশু। শুধু শয্যার অভাবে রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ফ্লোরে এমনকি সংশ্লিষ্টদের চলাচলের করিডরে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে অনেকের আদরের সন্তান। চলমান শৈত্যপ্রবাহ ও ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে রামেক হাসপাতালের করিডরে শয্যা পেতে চিকিৎসাধীন শিশু ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ বর্ণনার অযোগ্য। এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে প্রায় এক হাজার শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে একাধিক রোগীকে একই বেডে রাখা হচ্ছে, অনেককে থাকতে হচ্ছে করি ডোরে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) আইসিইউ সংকটে গত মার্চ মাসেই ২২৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। যাদের মধ্যে ৯১ জনই শিশু। আইসিইউ বেডের জন্য অপেক্ষমাণ অবস্থায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালে রাজশাহী শিশু হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মূল ভবন নির্মাণকাজ তিন বছরে শেষ হয়। এরপর ঠিকাদারকে আরো কিছু বাড়তি কাজ দেওয়া হয়। সেই কাজও ২০২৩ সালের জুনের আগেই শেষ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ দেড় বছর আগে নতুন ভবনসহ অন্যান্য সব কাজ সম্পূর্ণ শেষ হয়েছে। তবে ২০০ শয্যার এই শিশু হাসপাতালটি এখনো বুঝে নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দিয়ে ভবনটি হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করা হয়। ঠিকাদারের ইঞ্জিনিয়ার ফরহাদ সরকার জানান, রাজশাহী শিশু হাসপাতাল ভবনটি তারা পাহারা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এভাবে আর পাহারা দিয়ে সরঞ্জাম টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের পাহারাদার কিছু বলতে গেলেই চোরেরা কাচ ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। জানালার অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম খুলে নিয়ে যাচ্ছে। তারা হাসপাতাল ভবনটি বুঝে নিতে কত বার চিঠি দিয়েছেন; তা মনে করতে পারছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবন হস্তান্তরের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন না। সচেতন মহল জানিয়েছেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গেলে খুব করুণ দৃশ্য দেখা যায়। কী মানবেতরভাবে আমাদের শিশুদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশু হাসপাতালের জন্য জনগণের অর্থ ব্যয় তখনই সার্থক, যখন তা জনগণের উপকারে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজশাহী শিশু হাসপাতাল ভবন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালটি অবিলম্বে চালু করা উচিত। হাসপাতাল বুঝে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কাউসার সরকার বলেন, সমস্যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। হাসপাতালের পক্ষে কে বুঝে নেবে, এটা ঠিকই হয়নি। এ বিষয়ে রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম রাজিউল করিম বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রামেক পরিচালকের ওপর হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব দিলেও রামেক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এটি তাদের আওতাধীন নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হাসপাতাল দীর্ঘদিন চালু না হওয়া সমন্বয়হীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার বড় উদাহরণ। দ্রুত জনবল নিয়োগ ও প্রশাসনিক জট কাটানো না হলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরও শিশুর মৃত্যু ঘটবে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালটি অবিলম্বে চালু করা উচিত।