দুষণ আর খননের অভাবে পরিনত হয়েছে মরা খালে

কালীগঞ্জসহ জেলার ১২ টি নদী দখল

এফএনএস (টিপু সুলতান; কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) : | প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
কালীগঞ্জসহ জেলার ১২ টি নদী দখল

দখল, দূষণ এবং খননের অভাবে মরা খালে পরিণত হয়ে গেছে নদ-নদীগুলো। বিশেষ করে নবগঙ্গা নদী, চিত্রা নদী, কুমার, ইছামতি, ডাকুয়া, কপোতাক্ষসহ বেশির ভাগ নদী এখন মৃতপ্রায়। এতে শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নয়, হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতি। জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় নদীর এই অবস্থা।জেলা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা নবগঙ্গা নদী দিয়ে একসময় চলাচল করত বড় বড় নৌকা। সেই নদীতে এখন গরু চড়ে। নদীর তলদেশ জুড়ে জমেছে ময়লা-আবর্জনা, বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। এসব চর দখল করে স্থানীয় প্রভাবশালীরা চাষাবাদ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করছেন। 

ঝিনাইদহ ৬ উপজেলার ১২টি নদী এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। অবৈধ দখলের প্রভাবে নদীগুলোর মানচিত্র অনকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। কোন কোন নদী বেদখল হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদী দখল করে প্রভাবশালীরা তৈরী করেছে সুরম্য ভবন। প্রতিটি নদে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা আবার কোন কোন সময় মাছের চাষ ও করা হয়। দীর্ঘদিন খনন না করায় এক সময়ের খরস্রোত যৌবন হারানো নদীগুলো ধুকছে অতীত ঐতিহ্য নিয়ে।


ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছেন, ঝিনাইদহ ছয় উপজেলায় মোট ১২টি নদী আছে। এ সব নদীর মধ্যে রয়েছে ঝিনাইদহ-হরিণাকুন্ডু এলাকায় বেগবতি ও নবগঙ্গা,শৈলকুপায় কুমার,গড়াই, কালীগঙ্গা, মহেশপুরে বেতনা, ইছামতি ও কোদালা, কোটচাঁদপুরে কপোতাক্ষ নদ এবং ঝিনাইদহ-কালীগঞ্জে ফটকি, চিত্রা ও বেগবতি।এসব নদ-নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার।কালীগঞ্জে নদীর মাটি কেটে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছে।কোটচাঁদপুরের তালসার, ইকড়া গ্রাম, সদর উপজেলার গান্না, জিয়ানগর, কালীগঞ্জ শহরের পুরাতন বাজার, বলিদাপাড়া, হেলাই, নিমতলা ও ফয়লা এলাকায় চিত্রা নদী দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর তৈরী করা হয়েছে। কাগজে-কলমে চিত্রা নদীর প্রস্থ’ দেখানো হয়েছে ৮০ মিটার এবং গভীরতা ৫ মিটার। তবে দুষন, দখল আর ভরাটে এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চিত্রা নদী দখল মুক্ত করতে ২০২৩ সালে তালিকা তৈরী করা হলেও কালীগঞ্জের প্রভাব শালীদের বাঁধার কারণে হয়নি। শৈলকুপার কুমার নদটি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। ১৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুমার নদের পানির প্রধান উৎস ছিল মাথাভাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গার হাটবোয়ালিয়া এলাকায় নদের উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কুমার নদ কালীগঙ্গা, ডাকুয়া ও সাগরখালী নদীর মাধ্যমে পানি প্রবাহ পেতঝিনাইদহ খাজুরা এলাকার বাসিন্দা বীরেন হালদার বলেন, একসময় এই নদীতে মাছ ধরে আমাদের জীবিকা চলত। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, পানি নেই বললেই চলে। দ্রুত খনন না করলে নদী পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।আরাপপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা খাতুন বলেন, আগে আমাদের এই নদীতে অনেক পানি থাকত। গা-গোসল, ধোয়া-কাচার কাজ করতাম। এখনও একটুও পানি থাকে না। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহের ৬ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১২টি নদ-নদীর মোট আয়তন ১ হাজার ৬৪১ দশমিক ৭৫ হেক্টর। তবে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এসব নদীর অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।ছয় উপজেলার ১২ টি নদ-নদীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪১৩টি অবৈধ দখলদার সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তন্মধ্যে কালীগঞ্জে ৬২টি,ঝিনাইদহ সদরে ১৫টি,শৈলকুপায় ২২৩টি, হরিনাকুন্ডেু ৫৬টি, কোটচাঁদপুর ১০টি মহেশপুর ৪৭টি।  ঝিনাইদহ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, নদী পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথমেই উৎসমুখে নির্মিত বাঁধ অপসারণ জরুরি। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হলে উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু খনন করলেই হবে না, দখলমুক্ত ও দূষণ নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, নদী দখলমুক্ত করতে পর্যায়ক্রমে অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে