শশুরের জমি লিখে নেওয়ার দাবী

কালিয়াকৈরে দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে স্ত্রী সোনিয়া

আব্দুল আলিম অভি; কালিয়াকৈর, গাজীপুর
| আপডেট: ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম | প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
কালিয়াকৈরে দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর কবরের পাশে স্ত্রী সোনিয়া
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর লস্করচালা গ্রামের এক কোণে নিঃশব্দে জমে উঠেছে এক হৃদয়বিদারক মানবিক গল্প। যেখানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হারানোর বেদনা আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘ ছায়া মিশে গেছে একসঙ্গে। স্বামীর কবরের পাশে বসে দুই সন্তানকে নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন সোনিয়া বেগম। স্বামীর কবরের পাশে বসে থাকা সেই দৃশ্য যেন এক জীবন্ত প্রতীক। ভালোবাসা, বেদনা আর বঞ্চনার। পাশে দাঁড়িয়ে ৯ বছরের মেয়ে ছোঁয়া, যার চোখে এখনো শুকায়নি বাবাকে হারানোর অশ্রু। আর কোলে ১৮ মাস বয়সী অবুঝ শিশু, যে হয়তো বুঝতেই পারছে না জীবনের এই নির্মম বাস্তবতা। বাবার কবরের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট ছোঁয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠ যেন বাতাসকে আরো ভারী করে তোলেছে। “বাবা, তুমি কোথায় গেলা? আমরা কোথায় থাকব? আমাদের খাওয়াবে কে? স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোনিয়ার স্বামী সুজন মাহমুদ (৩৮) চার বছর ধরে ব্রেন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে গত ২ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ছিল সহায়তা, প্রয়োজন ছিল পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু সোনিয়ার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা যথাযথ সহযোগিতা করেনি। শ্বশুরবাড়িতে থাকার অধিকার নিয়েও শুরু হয় টানাপোড়েন। সোনিয়ার দাবি, শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়ি তাকে মেনে নিতে চান না। এমনকি স্বামীর দাফনের সময়ও শ্বশুরের অনুপস্থিতি নিয়ে এলাকাজুড়ে রয়েছে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন। শশুরের নামে ৫২ শতাংশ জমি আছে সেখান থেকে আমাদের প্রাপ্য জমি লিখে চেয়েছি। কিন্তু আমার শশুর জমি লিখে দিচ্ছেনা তাহলে আমি এই সন্তান দুটি নিয়ে কোথায় থাকবো। এই বাড়িতে থাকলে যেকোন সময় আমাদের বের করে দিবে তাই স্থায়ি সমাধান চাই। চাচাতো দেবর সাইফুল ইসলামের পরিবার মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। সেখানেই থাকছি,সেখানেই খাচ্ছি। তাই সুযোগ পেলেই আফসোস নিয়ে স্বামীর কবরের পাশেই বসে সময় কাটাই, তার জন্য দোয়া করি। আশ্রয়দাতা সাইফুল ইসলামের স্ত্রী জানান,সাংবাদিকরা লিখালিখি করার কারনে অনেকেই এখন সোনিয়ার সন্তানদের জন্য নগদ টাকা ও বিভিন্ন খাবার সামগ্রী এনে দিচ্ছেন। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভালোবেসে বিয়ে করার কারণে শুরু থেকেই সুজন মাহমুদের পরিবার সুজন ও তার বউকে মেনে নেয়নি। ফলে তারা পার্শ্ববর্তি মাঝখান গ্রামের আবুল কাশেমের বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করত। পরে সেখানে সোনীয়ার মায়ের সহায়তায় ৩ শতাংশ জমি ক্রয় করে ছোট একটি বাড়ি তৈরি করেছে। স্থানীয় দেলোয়ার হোসেন জানান, সব ধরনের পারিবারিক বিরোধ ভুলে অন্তত দুইটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করা উচিত। প্রতিদিন সাংবাদিক সহ বিভিন্ন লোকজন আসায় এলাকায় আতংক সৃষ্টি হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। এ বিষয় জানতে চাইলে সুজনের পিতা কফিল উদ্দিন মোবাইল ফোনে জানান,আমার বড় ছেলে সুজন ব্রেইন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ এপ্রিল মারা যায়। ছেলের লাশ বাড়িতে আনার পর আমার আপন ভাই সহ স্থানীয় কিছু লোকজন সুজনের স্ত্রী ও সন্তানদের নামে জমি লিখে দিতে বলে। তখন আমি বলি জমি লিখে দিতে হবে কেন।আমার নাতি নাত্নী বউমা সবাই জমির মালিক। আমি মারা গেলে আমার ৫২শতাংশ জমি যার যতটুকু অংশ তারা বুঝে নিবে। এ কথা বলতেই কিছু লোকজন আমাকে মারতে আসে কেউ কেউ পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করতে চায়। তাদের হুমকিতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে আমাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। এখন কিছুটা সুস্থ হলেও পুলিশ ও স্থানীয়দের ভয়ে বাড়ি গিয়ে এখনও ছেলের কবর দেখা ভাগ্যে জোটেনি। সুজনের ছোট ভাই সজীব বলেন, বাবা আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য বড় একটি ঘর দিয়েছে। কিন্তু বড়ভাই সুজন মাঝুখান এলাকায় ৩ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি বানিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে বসবাস করত। গত ২ এপ্রিল ভাই মারা গেলে ভাবি এখানে চলে আসেন তিনি বর্তমানে আমার চাচাতো ভাই সাইফুলদের বাড়িতে থাকেন। স্থানীয় কিছু লোকের কুপরামর্শে আমাদের নামে মামলা করেছে এবং মাঝে মধ্যে ভাইয়ের কবরের পাশে বসে থাকেন। সোনিয়ার ননদ সেতু জানান,আমার ভাই মারা যাবার পর থেকে বাবা অসুস্থ। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আমার বাড়ি গাজীপুরের আমবাগে এনে রেষ্টে রেখেছি। আমার ভাই বউ ও এলাকার কিছু মানুষের চাপে বাবা সহ আমরা বাড়িতে যেতে পারছি কালিয়াকৈর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, সোনিয়া যেহেতু বিধবা হয়েছে সে ইচ্ছে করলে বিধবা ভাতা বা লোন নিয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে। কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “দুই পক্ষই লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। যদি সমাধান না হয়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” বিষয়টি নিয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়েছে আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি সোনীয়া ও তার সন্তানদের খোঁজ খবর নিয়েছি, কিছু সহযোগিতা করেছি। আজ দুপুরে দুই পক্ষকে ডেকে এনে তাদের বক্তব্য শুনেছি উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মিমাংসার উদ্যোগ নিয়েছি। আগামীকাল শুক্রবার সকালে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও এমপি মহোদয়ের প্রতিনিধি সহ এলাকাবাসী সমঝোতা করে দিবেন মর্মে উভয় পক্ষ রাজি হয়েছেন। 
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে