রাজনৈতিক সহিংসতা

গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য সতর্ক সংকেত

এফএনএস | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য সতর্ক সংকেত

২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন নিহত এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। সংখ্যার এই ব্যাপ্তি শুধু সহিংসতার মাত্রাই নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সংকটকেও প্রতিফলিত করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতার ৯৪ শতাংশই ঘটেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং অন্যান্য দলের সঙ্গে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে। নিহতদের বড় অংশও বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা দলীয় শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর কর্মীদের হতাহতের ঘটনাও প্রমাণ করে যে সহিংসতা কোনো একক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক সংকটের অংশ। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সহিংসতা তুলনামূলক কম থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা হঠাৎ বেড়ে যায় এবং মার্চে ঘটনাসংখ্যা কিছুটা কমলেও প্রাণহানি বেড়ে যায়। এটি নির্দেশ করে যে সহিংসতার প্রকৃতি আরও সহিংস ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। আধিপত্য বিস্তার, নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধ, দলীয় কোন্দল এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতা-এসবই সহিংসতার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি রাজনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দলীয় কার্যালয় পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, তা সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি স্পষ্ট। হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনাগুলো শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নও সামনে আসছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো মতভেদ থাকা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। রাজনৈতিক সহিংসতার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকেও ব্যাহত করবে। তাই এখনই সময়, সকল পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে সহিংসতার এই চক্র ভাঙার।