লক্ষ্ণীপুরের রামগঞ্জে বিভিন্ন খালের ওপর নির্মিত স্লুইসগেটগুলো আজ উন্নয়নের এক বেদনাদায়ক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দৈনিক প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা গেছে, প্রায় দুই যুগ আগে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্দেশ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো এখন সম্পূর্ণ অকেজো। ফলে প্রত্যাশিত সুফল তো মিলছেই না, বরং সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন সংকট। বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এসব অচল স্লুইসগেট খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। খালজুড়ে জমে থাকা কচুরিপানা, পলি ও ময়লা-আবর্জনা পানির প্রবাহ রুদ্ধ করে ফেলেছে। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমিতে সেচের সংকট দেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। পাশাপাশি মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও হুমকির মুখে পড়ছে। অর্থাৎ, যেসব লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো ফলই ভোগ করছেন স্থানীয় মানুষ। এ সমস্যার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সমন্বয়হীনতা ও দায়বদ্ধতার অভাব। বিস্ময়কর হলেও সত্য, সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি সংস্থা-পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি, কৃষি বিভাগ কিংবা স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তর-কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না এই স্লুইসগেটগুলোর দায়িত্ব কার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি, যা অবশেষে এগুলোকে সম্পূর্ণ অচল করে ফেলেছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পর যদি তার দেখভালের কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো না থাকে, তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা এই ব্যর্থতাকে আরও স্পষ্ট করে। তাদের মতে, শুরুতে কিছুদিন কার্যকর থাকলেও দ্রুতই গেটগুলো নষ্ট হয়ে যায় এবং আর কখনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর ফলে কৃষিকাজে বিঘ্ন, উৎপাদন হ্রাস এবং আর্থিক ক্ষতির মতো বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। এ ধরনের পরিস্থিতি কেবল একটি উপজেলার সমস্যা নয়; এটি সারাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি বড় দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ-প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই হয় না। সমাধানে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে স্লুইসগেটগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা নির্ধারণ করতে হবে। এবং যেগুলো সংস্কারের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব, সেগুলোর পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। এছাড়াও যেসব কাঠামো সম্পূর্ণ অচল এবং ক্ষতির কারণ, সেগুলো অপসারণ করে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর কার্যকারিতা ও টেকসই ব্যবস্থাপনাই প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। রামগঞ্জের অচল স্লুইসগেটগুলো আমাদের সেই বাস্তবতাই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।