মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস

কৌশলগত প্রস্তুতি জরুরি

এফএনএস | প্রকাশ: ৪ মে, ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
কৌশলগত প্রস্তুতি জরুরি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সামপ্রতিক পূর্বাভাস আমাদের সামনে এক কঠোর বাস্তবতা উন্মোচন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও যুদ্ধের ছায়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে- এটি কেবল তেলবাজারের সমস্যা নয়; এর প্রতিক্রিয়া সরাসরি খাদ্য, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও জনজীবনের ব্যয়ে প্রতিফলিত হবে। বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই ধাক্কা দ্রুত ও তীব্র আঘাত হানতে পারে। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাব্য উত্থান দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়বে- সবশেষে ভোক্তা নির্ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সে ধাক্কা পড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হবে; ডলারের সংকট স্থানীয় মুদ্রাকে দুর্বল করে আমদানিমূল্য আরও বাড়াবে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে- বেকারত্ব বাড়লে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া চলবে না। সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি দুই স্তরে পরিকল্পনা জরুরি। সংক্ষিপ্ত মেয়াদে প্রয়োজন- জ্বালানি নির্ভরতা একক উৎসে কমিয়ে বিকল্প আমদানিকারক বাজার খুঁজে বের করা; স্ট্র্যাটেজিক স্টক ব্যবহার ও জরুরি আমদানি চ্যানেল সক্রিয় রাখা। সবচেয়ে দুর্বল গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে দ্রুত টার্গেটেড ভর্তুকি, খাদ্য ও জ্বালানি ভাউচার কার্যক্রম বাড়ানো। মূল্য মনিটরিং, জালিয়াতি দমন ও স্থানীয় সরবরাহশৃঙ্খলকে সচল করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। রেমিট্যান্স উৎসাহিত করা, হুন্ডি ও কালোবাজারি রোধে কড়া আইন প্রয়োগ এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি সাময়িকভাবে সীমিত করা। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে আমাদের লক্ষ্য হতে হবে- অর্থনীতিকে ঝুঁকি‑সহনশীল করা। এ জন্য দরকার: নবায়নযোগ্য শক্তিতে দ্রুত বিনিয়োগ, জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তি গ্রহণ, স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন বাড়ানো এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য বিস্তৃত করা। কৃষিতে প্রযুক্তি ও সেচ উন্নয়ন করে খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি‑শক থেকে কৃষি খাত কম প্রভাবিত হয়। একই সঙ্গে মানবসম্পদে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক শক মোকাবিলায় কর্মবাজার নমনীয় থাকে। নীতিনির্ধারকরা যদি স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বিত নীতি গ্রহণে ব্যর্থ হন, তবে আইএমএফ‑এর সতর্কবার্তা কেবল ভবিষ্যৎ সংকটের পূর্বাভাসই নয়- সেই সংকট বাস্তবে পরিণত হবে। কিন্তু সঠিক কৌশল ও সময়োপযোগী পদক্ষেপে আমরা এই ঝড়কে সামলাতে পারি এবং ক্ষতি সীমিত রাখতে পারি।