হাওরের কৃষি

ত্রিমুখী সংকটে নীতিগত প্রস্তুতির পরীক্ষা

এফএনএস | প্রকাশ: ৪ মে, ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
ত্রিমুখী সংকটে নীতিগত প্রস্তুতির পরীক্ষা

হাওরাঞ্চলের কৃষি আবারও প্রকৃতি ও ব্যবস্থাপনার দ্বৈত চাপে পড়েছে। আগাম বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং ধান কাটার যন্ত্রের ঘাটতি-এই তিনটি সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে কৃষকেরা ফসল ঘরে তোলা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। দেশের অন্যতম প্রধান ধানভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলটির সংকট কেবল স্থানীয় নয়; এটি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৈনিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, আগাম বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর ফলে সরাসরি ক্ষতির পাশাপাশি দীর্ঘসময় পানিতে থাকার কারণে ধানের অঙ্কুরোদ্গমের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা কৃষকের পরিশ্রমকে মুহূর্তেই নষ্ট করে দিতে পারে। হাওরের কৃষি এমনিতেই সময়নির্ভর; ফসল পাকলেই দ্রুত কাটতে না পারলে সামান্য প্রাকৃতিক পরিবর্তন বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থায় শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অতীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মৌসুমি শ্রমিকরা হাওরে এসে ধান কাটার কাজ করলেও এবার তাদের উপস্থিতি কম। ফলে শ্রমের মজুরি বেড়েছে এবং সময়মতো ফসল কাটা সম্ভব হয়নি অনেক ক্ষেত্রে। অন্যদিকে যান্ত্রিকীকরণকে বিকল্প হিসেবে ধরা হলেও হারভেস্টারের স্বল্পতা ও বণ্টন বৈষম্য কৃষকদের হতাশ করছে। কোথাও কোথাও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। সরকারি পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে তার ফারাক স্পষ্ট। অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, ড্রায়ার মেশিন সরবরাহ কিংবা আন্তঃজেলা সহায়তার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক, তবে এগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে সময়োপযোগী ও সমন্বিত বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে হাওরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে বিলম্বিত উদ্যোগ প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং আগাম বৃষ্টির ঝুঁকি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় হাওরাঞ্চলের কৃষিতে পরিকল্পিত যান্ত্রিকীকরণ, সহজলভ্য প্রযুক্তি এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শুধু যন্ত্র সরবরাহই নয়, তার ন্যায্য বণ্টন, ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের নাগালের মধ্যে আনা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় রাখা জরুরি। যদি উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়, তবে তা বাজারে প্রভাব ফেলবে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াবে। ফলে হাওরের এই সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। হাওরাঞ্চলের কৃষি সংকট আমাদের নীতিগত প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। প্রাকৃতিক ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও পূর্বপ্রস্তুতি, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ-যাতে প্রতি মৌসুমে কৃষকদের একই অনিশ্চয়তার মুখে না পড়তে হয়।