রেললাইনের লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বেড়েই চলেছে

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৮ মে, ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
রেললাইনের লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বেড়েই চলেছে

বাংলাদেশে রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা এখন এক ভয়াবহ জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে তিনজন করে মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এসব দুর্ঘটনায়। গেটম্যানের অনুপস্থিতি, অবৈধ ক্রসিং, যানজট এবং জনসচেতনতার অভাব মিলিয়ে লেভেল ক্রসিংগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সামপ্রতিক কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জনের মৃত্যু এই সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকই অবৈধ। বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যেও অর্ধেকের বেশি জায়গায় গেটম্যান নেই। ফলে ট্রেন আসার সময় সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো কেউ থাকেন না। অনেক জায়গায় স্থানীয়রা নিজেরাই বাঁশ বা দড়ি দিয়ে রাস্তা আটকে রাখেন। রাজধানীর খিলক্ষেত, মগবাজার ও গোপীবাগের ক্রসিংগুলোতে প্রতিদিন নারী, শিশু ও বয়স্করা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করেন। রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ১০ বছরে এসব ক্রসিংয়ে মারা গেছেন ২৬৩ জন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১,২৬৯ জনের। রেলওয়ে পুলিশের তথ্য আরও ভয়াবহ- গত এক দশকে রেল দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ৯,২৩৭ জনের। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রেন আসার আগে লেভেল ক্রসিং বন্ধ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এটি স্টেশন থেকে ক্রসিংয়ের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় মানুষ নিয়ম না মেনে জোর করে গেট ভেঙে ঢুকে পড়ে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কম নেওয়া হয়। গেটম্যানদের সচেতন করতে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম ও মনিটরিং জোরদার করা হয়। তবে রাতের নির্জনতায় ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। মানুষের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো রেলক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা কমাতে ওভারপাস বা আন্ডারপাস নির্মাণ সম্ভব কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি রেলক্রসিংগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে ট্রেন প্রবেশ করলেই ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে যাবে, এমন প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগেও লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনা এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিনির্ভর। মূল সমাধানের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মেট্রোরেল পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। রেলওয়েকেও ধাপে ধাপে সেই পথে যেতে হবে। লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনার পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট এবং মানবিক ত্রুটি- সব মিলিয়েই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কার্যকর প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ। দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার শোক ও আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেক সময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা যান। ফলে পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। এদিকে, আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, ভারত ও পাকিস্তানে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা কমাতে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ইউরোপে প্রায় সব ক্রসিংয়ে ব্যারিয়ার ও সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। বাংলাদেশে এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা হচ্ছে। সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংগুলোতে দ্রুত ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল, সেন্সর ও ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে চালক ও পথচারীদের জন্য নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে। ট্রেন আসার সময় ক্রসিং অতিক্রম করলে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। সব মিলিয়ে রেললাইনের লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এখন জাতীয় নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ব্যবহার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়। সরকার ইতিমধ্যেই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে দ্রুত বাস্তবায়নই এখন জরুরি।