ফেরিতে গাড়ি ওঠা-নামার নির্দেশনা মানতে অনীহা যাত্রীদের মধ্যেও

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ মে, ২০২৬, ০৮:২৬ এএম
ফেরিতে গাড়ি ওঠা-নামার নির্দেশনা মানতে অনীহা যাত্রীদের মধ্যেও

এফএনএস এক্সক্লুসিভ: রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে গত ২৫ মার্চ ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বাসডুবির ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানো পরিবারগুলোতে শোক এখনও মুছে যায়নি। এ ঘটনার পর বাস্তবে কোনো স্থায়ী পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে না। যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল- ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর আগে শতভাগ যাত্রী নামানো, পন্টুনে নিরাপত্তা ব্যারিয়ার স্থাপন এবং ফেরিঘাটে কড়াকড়ি বাড়ানো- এসবের বাস্তবায়ন অনিয়মিত ও অসম্পূর্ণ। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে এখনো যাত্রী নিয়ে বাস ফেরিতে ওঠার ঘটনা ঘটছে; চালক, সুপারভাইজার ও ঘাট কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায়িত্ববোধের অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং যাত্রীদের অমনোযোগ মিলিয়ে ফেরিঘাটগুলো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুর্ঘটনার দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে যে তদন্ত, নির্দেশনা ও প্রতিশ্রুতি এসেছে, সেগুলো কাগজে থাকলেও মাঠে তা কার্যকর হচ্ছে না- এটাই স্থানীয়দের অভিযোগ। সরেজমিনে দেখা গেছে, পাটুরিয়া ঘাটে প্রতিটি বাসই যাত্রী নামিয়ে ফেরিতে ওঠার নিয়ম মানছে না; চালকরা যাত্রীদের নামাতে অনীহা দেখাচ্ছেন, আর যাত্রীরাও গরম, রোদ বা সময় বাঁচানোর কারণে নামতে রাজি হচ্ছেন না। সাংবাদিক উপস্থিতি টের পেলে ঘাট কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে- কিছু বাস থেকে যাত্রী নামানো হয়- কিন্তু সাংবাদিক চলে গেলে আবার আগের অবস্থা ফিরে আসে। এই অস্থায়ীতা নির্দেশ করে যে তদারকি কার্যত নাটকীয়; নিয়ম মানানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বাসচালক ও সুপারভাইজাররা তাদের আচরণকে যৌক্তিক করার চেষ্টা করেন। তারা বলছেন, যাত্রীদের অনিচ্ছা, গরম-রোদ, অসুস্থ যাত্রী ও সময়সীমার চাপ তাদেরকে বাধ্য করে ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে ওঠাতে। কিছু চালক দাবি করেন, কোম্পানি থেকে যাত্রী নামানোর নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে যাত্রী নামাতে গেলে তারা যাত্রীদের রোষানলে পড়েন; যাত্রীরা নামতে অস্বীকার করলে চালকরা বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নেন। ঘাট কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি বা তদারকির অভাবকে তারা দায়মুক্তির কারণ হিসেবে দেখান। অন্যদিকে ঘাট কর্তৃপক্ষ বলছে, নিয়ম মেনে বাস ওঠানো হচ্ছে; শিফট পরিবর্তনের সময়ে অগোচরে কিছু বাস ফাঁকি দিয়ে উঠতে পারে- তবে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে এবং পন্টুনে নিরাপত্তা ব্যারিয়ার দ্রুত স্থাপন করা হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এই কথাবার্তায় স্পষ্ট যে, দায়িত্ব ভাগাভাগি হলেও বাস্তব নিয়ন্ত্রণ নেই। পন্টুনে নিরাপত্তা ব্যারিয়ার স্থাপনের নির্দেশনা থাকলেও এক মাস পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। কিছু সরঞ্জাম পড়ে থাকলেও প্রকৃত স্থাপন ও কার্যকরী ব্যারিয়ার দেখা যায়নি। পন্টুনে ব্যারিয়ার না থাকায় ফেরি ও পন্টুনের মধ্যে গাড়ি ওঠানামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানো সহজ হয়ে পড়ে; সামান্য ত্রুটিতেই গাড়ি পিছলে নদীতে পড়ে যেতে পারে- এটাই ঘটেছে ২৫ মার্চ। নিরাপত্তা ব্যারিয়ার না থাকায় ফেরির ডেকে গাড়ি ওঠানোর সময় কোনো দৃঢ় বাধা নেই, ফলে চালকরা সামান্য ভুল করলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ফেরি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও স্পষ্ট। বিআইডব্লিউটিসি, স্থানীয় প্রশাসন, নৌরক্ষী ও ফেরি কর্তৃপক্ষ- এসব সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রম সমন্বিত নয়। শিফট বদল, ডিউটি রোস্টার, জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা- এসব বিষয়ে স্পষ্ট প্রটোকল থাকলেও তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি শিফটে দায়িত্ব পালনে ফাঁক থেকে যায়; শিফট পরিবর্তনের সময়ে তৎপরতা কমে যায় এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়। দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারগুলোতে যে শোক ও আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে, তা দ্রুত মিটছে না। অনেক পরিবারই একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে; তাদের চিকিৎসা, দাফন ও আইনি প্রক্রিয়ার খরচ বহন করতে গিয়ে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয় নেতারা বলছেন, ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা দ্রুত ও যথাযথভাবে না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যস্ত হবে। সরকারি তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হলেও তা পৌঁছাতে সময় লাগছে; প্রশাসনিক জটিলতা ও কাগজপত্রের বাধা পরিবারগুলোকে আরও কষ্ট দিচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার পাশাপাশি সামাজিক আচরণগত কারণগুলোও দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতার অভাব, চালকদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, এবং ঘাটে উপস্থিত দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিয়ম- এসব মিলিয়ে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেক যাত্রীই জানেন যে ফেরিতে ওঠার আগে নামতে হবে, তবু তারা নামতে অস্বীকার করেন; কারণ গরম, সময়ের তাড়াহুড়া বা অনভিপ্রেত অসুবিধা। চালকরা জানেন যে যাত্রী নামালে সময় নষ্ট হবে, তাই তারা দ্রুত পারাপার করতে চান। এই আচরণগত চক্র ভাঙতে না পারলে প্রশাসনিক নির্দেশনা কাগজেই আটকে থাকবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পন্টুনে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যারিয়ার, ফেরি ও পন্টুনের মধ্যে স্পষ্ট চিহ্নিত লাইন, গাড়ি ওঠানামার সময় নিয়ন্ত্রণের জন্য সিগন্যাল ব্যবস্থা, ওজন নির্ণায়ক এবং ফেরি ক্যাপাসিটি মনিটরিং সিস্টেম থাকলে ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এছাড়া ঘাটে পর্যাপ্ত আলো, জরুরি রেসকিউ সরঞ্জাম, লাইফবোট ও লাইফজ্যাকেটের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা দ্রুত স্থাপন না করলে কেবল নিয়ম জারি করলেই কাজ হবে না। এদিকে, ঘাটে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যে অনেকেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি; জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, যাত্রীদের কীভাবে নিরাপদে নামাতে হবে, ফেরি চালকেরা কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবেন- এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ড্রিল প্রয়োজন। শিফট বদলের সময় হ্যান্ডওভার প্রক্রিয়া শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা, দায়িত্বপ্রাপ্তদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং মনিটরিং টিম গঠন করে নিয়মিত অডিট চালানো জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় নেতারা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ ও গণমাধ্যমকে একসাথে কাজ করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ফেরিঘাটে নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত ক্যাম্পেইন, পোস্টার, মাইকিং ও সামাজিক প্রচারণা চালালে যাত্রীদের আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব। স্থানীয়দের মধ্যে একটি সামাজিক চাপ তৈরি করা দরকার যাতে কেউই ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে ওঠে না; সামাজিক লজ্জা ও সমালোচনার ভয়ে চালকরা নিয়ম মানতে বাধ্য হবেন। দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ছাড়া পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন। প্রশাসনকে কেবল নির্দেশ জারি করেই সন্তুষ্ট না হয়ে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং, অডিট ও জরিমানা কার্যকর করতে হবে। যারা নিয়ম ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত- চালক, সুপারভাইজার, ফেরি ক্যাপ্টেন কিংবা ঘাট কর্তৃপক্ষ- যারা দায়িত্বে অবহেলা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।