অসমাপ্ত কোরবানী

মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু | প্রকাশ: ৩১ মে, ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
অসমাপ্ত কোরবানী

ঈদের চাঁদ উঠেছিল স্নিগ্ধ আলোয়,

তাকবির ধ্বনি ভাসছিল বাতাসে।

বাংলার পথে পথে তখন

উৎসব নেমেছিল ধীরে ধীরে।

হাটজুড়ে মানুষের ভিড়,

কোলাহলে মুখর চারদিক।

কেউ দরদাম করছে,

কেউ স্বপ্ন দেখছে,

কেউ ভাবছে কোরবানির সকাল।

ঠিক সেই ভিড়ের মাঝখানে

দাঁড়িয়ে ছিল এক শুভ্র মহিষ—

নীরব, শান্ত, গম্ভীর।

চোখে তার অদ্ভুত কোমলতা,

চলনে ধীর-স্থির সৌন্দর্য।

মুখের গড়নে যেন

দূর দেশের এক আলোচিত মুখের ছায়া।

মানুষ থেমে তাকিয়েছে,

কেউ বিস্ময়ে হেসেছে,

কেউ মোবাইল তুলে ছবি ধরেছে।

মুহূর্তেই তার গল্প

হাওয়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছে

এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

চায়ের কাপে,

রাস্তার আড্ডায়,

আলোর ঝলমলে পর্দায়—

সবখানেই ভেসে উঠেছিল

শুভ্র সেই মহিষের কথা।

শিশুরা ভিড় করত তাকে দেখতে,

বয়স্করা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকত।

কেউ বলত—

“এ যেন সাধারণ কোনো প্রাণী নয়!”

যিনি তাকে লালন করেছিলেন,

তিনি ছিলেন সাধারণ এক খামারি।

দিনের পর দিন

নিজের সন্তানের মতো যত্নে

বড় করেছিলেন প্রাণীটিকে।

রোদে পুড়েছেন,

বৃষ্টিতে ভিজেছেন,

অভাবের দিন পার করেছেন—

তবু বুকের ভেতর

একটাই স্বপ্ন জেগেছিল।

ঈদের হাটে

ভালো দামে বিক্রি হবে মহিষটি,

সংসারের ক্লান্ত মুখে

ফিরে আসবে একটু হাসি।

শেষ পর্যন্ত

এক কোরবানিদাতা

মহিষটিকে কিনেও নিলেন।

তার চোখেও ছিল তৃপ্তি।

তিনি ভেবেছিলেন—

সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটিকেই

স্রষ্টার নামে উৎসর্গ করবেন।

চারদিকে তখন

উৎসবের উচ্ছ্বাস।

মানুষ বলছিল—

“এই কোরবানি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

কিন্তু হঠাৎ

বদলে গেল চারপাশ।

কিছু অদৃশ্য চাপ,

কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত,

কিছু ক্ষমতার ছায়া

নেমে এলো নীরবে।

যে মহিষটির যাওয়ার কথা ছিল

কোরবানির মাঠে,

তাকে ফিরিয়ে নেওয়া হলো।

মূল্য ফিরিয়ে দিয়ে

রাখা হলো

লোহার ঘেরা নীরব বন্দিত্বে।

সেদিন শুধু

একটি প্রাণী আটকে যায়নি—

আটকে গিয়েছিল

দুইটি মানুষের স্বপ্ন।

যিনি লালন করেছিলেন,

তার বহু দিনের পরিশ্রম

নিঃশব্দে ভেঙে পড়েছিল।

যিনি কোরবানি দিতে চেয়েছিলেন,

তার বুকভরা ত্যাগ

অপূর্ণ থেকে গেল।

ঈদের সকাল এসেছিল ঠিকই,

তাকবির ধ্বনি উঠেছিল আকাশে,

তবু কোথাও যেন

একটি শূন্যতা রয়ে গিয়েছিল।

কোরবানির মাঠে

রক্ত ঝরেনি সেদিন,

তবু মানুষের হৃদয়ে

নেমেছিল গভীর এক বেদনা।

চায়ের দোকানে,

গ্রামের মোড়ে,

নগরের ব্যস্ত রাস্তায়—

একই প্রশ্ন ভেসে উঠেছিল বারবার—

ত্যাগের উৎসবেও

কেন এত অপূর্ণতা?

কোরবানি

শুধু নিয়ম নয়,

এ এক বিশ্বাস,

একটি অনুভূতি,

একটি আত্মসমর্পণের শিক্ষা।

সেই অনুভূতির পথে

যখন অদৃশ্য দেয়াল উঠে দাঁড়ায়,

তখন কষ্টটা

একজনের ভেতরে থেমে থাকে না—

ছড়িয়ে পড়ে

অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে।

শুভ্র সেই মহিষটি

হয়তো কিছুই বুঝতে পারেনি।

সে শুধু নীরব চোখে দেখেছিল

মানুষের ভাঙা আনন্দ,

অপূর্ণ ইচ্ছা,

থেমে যাওয়া এক উৎসবের ছবি।

আজও সেই দৃশ্য

মানুষের মনে ভেসে ওঠে—

কিছু কোরবানি

রক্ত ছাড়াই ইতিহাস হয়ে যায়,

কিছু দীর্ঘশ্বাস

নিঃশব্দে কাঁপিয়ে দেয়

একটি পুরো জাতির হৃদয়।