তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত

বাংলাদেশের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৬, ০৮:২২ এএম
বাংলাদেশের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে

চলতি বছর তাপপ্রবাহ, খরা ও অনিয়ম বৃষ্টিপাত বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানিসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনির্ভর জীবনযাত্রা সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের ঘাটতি, খরা, ফসলহানি, পানিসংকট এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে চলতি মাসের শুরুতেই দেশের অর্ধেকেরও বেশি জুড়েই মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে সামনের দিনগুলোতে তাপপ্রবাহ আরো তীব্র হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চলতি জুন মাসে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে স্বাভাবিকের তুলনায় তাপমাত্রা বেশি থাকতে পারে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আর বাংলাদেশের কৃষি এখনো প্রকৃতিনির্ভর। আমন ধান পুরোপুরি নির্ভরশীল বর্ষার ওপর, আর বোরো ধান উৎপাদনের জন্য ব্যাপক সেচ প্রয়োজন। এল নিনোর কারণে এবার যদি বর্ষা দেরিতে আসে কিংবা বৃষ্টিপাত কম হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে আমন মৌসুম। বৃষ্টি কম হলে আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হবে। দীর্ঘ খরায় জমি শুকিয়ে যাবে। আবার দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ অতিবৃষ্টি হলে ক্ষেত তলিয়ে যেতে পারে। তাতে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা, সবজি ও ফল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বাড়ছে, শীতকাল ছোট হয়ে আসছে এবং প্রয়োজনের সময় বৃষ্টি পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন না করতে পারলে বড় সংকটে পড়বে দেশের কৃষি খাত। ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনে হাওরাঞ্চল ক্ষতির শিকার হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জে চলতি বছরের অতিবৃষ্টিতে অনেক জমি তলিয়ে গেছে। আবার বর্ষা বিলম্বিত হলে কিংবা বৃষ্টি কমে গেলে পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়বে। তাছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন ঝুঁকি হলো লবণাক্ততা বৃদ্ধি। নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়তে পারে কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও পানীয় জলের সঙ্কট। এমন পরিস্থিতিতে তাপপ্রবাহকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে তার অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য আরো বেশি হতে পারে।

সূত্র জানায়, এল নিনোর প্রভাব সরাসরি জনস্বাস্থ্যেও আঘাত হানবে। দীর্ঘ তাপপ্রবাহের ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়বে। তবে শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। পাশাপাশি আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং পানিবাহিত রোগের বিস্তারের আশঙ্কা থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি পরিণত হয়েছে জনস্বাস্থ্য সঙ্কটেও। সাধারণত বাংলাদেশে জুন মাসে বর্ষা শুরু হয়। আর ওই মৌসুমি বৃষ্টির ওপরই কৃষিকাজ, নদনদীর প্রবাহ, ভূগর্ভে পানির প্রতিস্থাপনসহ সবকিছুই নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি জুনে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। সাধারণত জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। তবে এল নিনোর প্রভাবে এবার বৃষ্টিপাত কম হলে কৃষি, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ভূগর্ভের পানির ওপর নির্ভর করে কৃষি উৎপাদন হয়, সেসব এলাকায় সেচ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

সূত্র আরো জানায়, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জলবায়ুগত ঘটনাই হচ্ছে এল নিনো। যা পরিবর্তন করে দেয় পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ভারসাম্য। লা নিনোর ফলে বিশ্বের এক অংশে ভয়াবহ খরা দেখা দেয় আর অন্য অংশে হয় অতিবৃষ্টি ও বন্যা। কোথাও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বয়ে যায় আবার কোথাও আবার অস্বাভাবিক ঝড়ের প্রকোপ বাড়ে। এল নিনোর ফলে বাংলাদেশের বর্ষা বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। তাতে বাড়তে পারে খরা ও তাপপ্রবাহ। যা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ দেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এমনিতেই খরাপ্রবণ এলাকা। তার মধ্যে ওসব অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে দ্রুত পানির সংকট দেখা দিতে পারে। আর দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে কৃষককে সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, অন্যদিকে ভূগর্ভে পানির স্তরও দ্রুত নেমে যায় নিচে।

এদিকে জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনো তাপপ্রবাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ফলে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, আলাদা বাজেট, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা কাঠামো নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে কার্যক্রম থাকলেও তাপপ্রবাহ নিয়ে কার্যকর কোনো কর্মসূচি নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরেরও তাপপ্রবাহকেন্দ্রিক গবেষণা বা সচেতনতামূলক প্রকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশকে এখন তাপপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক নীতি, আগাম সতর্কবার্তা, নগর পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।

অন্যদিকে এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে যেখানে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়তো, এখন সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও আগের মতো কমছে না। ফলে মানুষের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, তাপমাত্রা কমাতে নগর বনায়ন ও বৃক্ষ রোপণের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম, ভোলা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বাগান সমপ্রসারণ করা হবে। সড়ক, মহাসড়ক ও বাঁধের পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাখ লাখ চারা রোপণ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে