লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতায় বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলসহ আটক এক মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। উদ্ধারকৃত মাদক আত্মসাৎ করে মাত্র ৭ বোতল ফেনসিডিল ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে মামলা দায়েরের এই ঘটনায় জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী বিষয়টি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালে অভিযুক্ত বড়খাতা পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক এএসআই আনিসকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত রবিবার (১৪ জুন) হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা তিস্তা ব্যারেজ সংলগ্ন গ্রামীণ রাস্তায় বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে হাতেনাতে আটক করে গ্রামবাসী। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন করা হলে বড়খাতা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই আনিস ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি স্থানীয়দের সহায়তায় ফেনসিডিল ও আটক আসামিকে নিয়ে ফাঁড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, থানায় মামলা দায়েরের পর জানা যায়, আটক আসামিকে গোপনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিলের স্থলে মাত্র ৭ বোতল ফেনসিডিল ‘পরিত্যক্ত’ দেখিয়ে একটি সাজানো মামলা করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে রহস্যজনকভাবে পরবর্তীতে ভিডিওটি ফেসবুক থেকে ডিলেট করা হয়। লালমনিরহাট জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গ্রামবাসী বিষয়টি পুলিশ সুপারকে সরাসরি অবগত করলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং এএসআই আনিসকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
হাতীবান্ধা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রমজান আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়টি আমরা দেখেছি। গ্রামবাসীরা সরাসরি পুলিশ সুপার মহোদয়কে জানিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ওসি এএসআই আনিসের বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তাকে বাঁচাতেই তড়িঘড়ি করে এই বদলি বা প্রত্যাহারের নাটক সাজানো হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, বড়খাতা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়ানোর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও এই ফাঁড়ির এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক ব্যবসায়ীর টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে স্থানীয়দের তোপের মুখে সেই টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ।
স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রন্টু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেই যদি মাদক ব্যবসা ও অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তবে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা অসম্ভব। সম্প্রতি লালমনিরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটকে সম্পূর্ণ মাদক ও সামাজিক অপরাধমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। মন্ত্রীর এমন কঠোর ঘোষণার মাঝেই পুলিশের খোদ মাদক কারবারিকে সুবিধা দেওয়া এবং মাদক আত্মসাতের এই ঘটনা জেলা প্রশাসনের মাদকবিরোধী অভিযানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই বিষয়ে লালমনিরহাট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মাদক ও দুর্নীতির ব্যাপারে জেলা পুলিশ 'জিরো টলারেন্স' নীতি অবলম্বন করে। অপরাধী যেই হোক, পুলিশের পোশাক গায়ে দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। গ্রামবাসীর অভিযোগ পাওয়ার পরপরই অভিযুক্ত এএসআইকে ক্লোজড করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে মাদক আত্মসাৎ ও আসামি ছেড়ে দেওয়ার সত্যতা প্রমাণিত হলে বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।