কলাপাড়ায় ইউএনওর উদ্যোগে বন্ধ হচ্ছে অনিয়ম

মৃত ব্যক্তিদের নামে ভাতা উত্তোলন, বছরে অপচয় ৬৬ লাখ টাকা

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ১৮ জুন, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
মৃত ব্যক্তিদের নামে ভাতা উত্তোলন, বছরে অপচয় ৬৬ লাখ টাকা

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় মৃত ব্যক্তিদের নামে বছরের পর বছর বয়স্ক ও বিধবা ভাতা উত্তোলনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, অন্তত ৯২৩ জন মৃত ব্যক্তির নামে এখনও নিয়মিত বয়স্কভাতা এবং ২৬৪ জন মৃত ব্যক্তির নামে বিধবা ভাতা উত্তোলন করা হচ্ছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদের উদ্যোগে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের তালিকা পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এ অনিয়মের তথ্য সামনে আসে। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরে তিনি জানান, এভাবে ৯২৩ মৃত ব্যক্তির নামে প্রতি মাসে ৬০০ টাকা হারে বয়স্কভাতা উত্তোলনের ফলে সরকারের মাসিক ক্ষতি হচ্ছে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ টাকা। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা।

ইউএনও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তালিকা হালনাগাদ না হওয়া, যথাযথ তদারকির অভাব এবং ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে এই অনিয়ম চলতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে উপকারভোগী ব্যক্তির মৃত্যুর পরও তাদের মোবাইল নম্বর পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করে ভাতার টাকা উত্তোলন করছেন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলায় বর্তমানে বয়স্কভাতা প্রাপ্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১১ হাজার ৭১৪ জন। ১২টি ইউনিয়নে পরিচালিত যাচাই-বাছাইয়ে মৃত ৯২৩ জন ভাতাভোগীর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চাকামইয়া ইউনিয়নে ৮৪ জন, টিয়াখালীতে ৩২ জন, লালুয়ায় ৮৫ জন, মিঠাগঞ্জে ৫৭ জন, নীলগঞ্জে ১১৬ জন, মহিপুরে ২৮ জন, লতাচাপলীতে ৬৩ জন, ধানখালীতে ৭৯ জন, ধুলাসারে ১৩০ জন, বালিয়াতলীতে ১২৮ জন, ডালবুগঞ্জে ৬৪ জন এবং চম্পাপুর ইউনিয়নে ৬১ জন মৃত ভাতাভোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে।

তদন্তে আরও জানা গেছে, এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ কেউ সাত থেকে আট বছর আগেই মারা গেছেন। কিন্তু তাদের নাম এখনও সরকারি তালিকায় বহাল রয়েছে এবং নিয়মিত ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত উপকারভোগী অন্তত ৯২৩ জন প্রবীণ ব্যক্তি নতুনভাবে বয়স্কভাতা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

একইভাবে বিধবা ভাতা কর্মসূচিতেও অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ১২টি ইউনিয়নে মৃত ২৬৪ জন নারীর নামে এখনও বিধবা ভাতা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও নারীদের বিধবা ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকার অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান দাবি করেন, ভাতাভোগীদের পরিবার অনেক সময় মৃত্যুর তথ্য গোপন রাখে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করে না। ফলে অনিচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের ভুল থেকে যেতে পারে। তবে দীর্ঘ সাত-আট বছর ধরে তথ্য হালনাগাদ না হওয়ার বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, মৃত ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে সমানসংখ্যক নতুন যোগ্য প্রবীণ ব্যক্তিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনে বয়স্কভাতা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব ইউনিয়ন পরিষদকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইউএনও কাউছার হামিদ বলেন, সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে তালিকা নিয়মিত হালনাগাদের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এদিকে মৃত ব্যক্তিদের নামে ভাতা উত্তোলনের বিষয়টি এখন কলাপাড়া পৌর শহর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে আলোচনার প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে