পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বরফ তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে খাল-বিল ও জলাশয়ের দূষিত পানি। ফ্রি-স্টাইলে যুগের পর যুগ দূষিত পানির উৎপাদিত বরফ দিয়ে সমুদ্র কিংবা নদী থেকে আহরিত ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ কওে বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব দূষিত বরফের মাছ খেয়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এমনকি মরনব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্তের ঝুঁকিও বাড়ছে। এছাড়া এই দূষিত পানির দূষিত বরফে সংরক্ষণ করা মাছের গুণগত মানও নষ্ট হয়ে যায়। পলে জেলেরা মাছের ন্যায্য দামও পায় না। কলাপাড়ায় অন্তত ৬০টি বরফকল থাকলেও মাত্র একটি বরফকলের নিরাপদ পানির ব্যবহারে বরফ উৎপাদনে ফিল্টার ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে কলাপাড়ার উপকূলে ডিপ কিংবা শ্যালো স্থাপন করেও সুপেয় পানি পাওয়া যায় না। এই সংকটের কারণে ফ্রি-স্টাইলে দূষিত পানির তৈরি বরফ দিয়ে কলাপাড়া উপজেলায় প্রতি বছর ইলিশসহ অন্তত ৫০ হাজার মেট্রিকঁন সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ করা হয়। হয় বাজারজাতকরণ। যা মানুষের খাবারের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত নয়। নয় নিরাপদ।
উপজেলা প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, মানবস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ এবং মৎস্য সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখতে বরফ তৈরিতে ব্যবহৃত পানির নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মূলত: পানযোগ্য পানির ব্যবহার, পানির লাইন পৃথকীকরণ, নিয়মিত ল্যাবটেস্ট, পানির ট্যাংক ও কাঠামো পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে কলাপাড়া উপজেলার মুন, লাবীবা, ভাই ভাই, জমজম, তামান্না আইসপ্লান্টে বরফকলের পানির মাণ যাচাইয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক এই অভিযান পরিচালনা করেন।
তিনি জানান, বরফকল গুলোয় বরফ উৎপাদনে ব্যবহৃত পানির উৎস, আশপাশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা হয়। ব্লিচিং পাউডার ছিটানো হয়। কুয়াকাটা সি ফুড আইসপ্ল্যান্টে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় ফিল্টার ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। যেহেতু এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রত্যেক বরফকলে এই ধরনের ফিল্টার সেট করা সম্ভব নয়। তাই ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেখান থেকে পানি সরবরাহও করা যেতে পারে। তাই কুয়াকাটায় দেড় একর জমিতে একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, মাছ অত্যন্ত পুষ্টিকর ও দ্রুত পচনশীল খাদ্য। মাছ ধরার পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত এর সতেজতা বজায় রাখতে বরফের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে যদি মাছ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত বরফ অনিরাপদ বা দূষিত পানির মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে সেই বরফ মাছকে নিরাপদ রাখার পরিবর্তে জীবাণু ও রাসায়নিক দূষণের উৎসে পরিণত হতে পারে। এর ফলে মাছের গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হয়, খাদ্যজনিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি হয়। শুধু তাই নয়, কৃষিজ রাসায়নিক,কীটনাশক,আগাছানাশক,সারজাতীয় রাসায়নিক প্রয়োগ করা পানির উৎস থেকে সংগৃহীত পানির বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে ওই মাছ খেয়ে বিষক্রিয়ায় হরমোনজনিত সমস্য দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদী ক্যান্সারের প্রবল ঝুঁকি থাকছে।
দূষিত পানির তৈরি বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে মাছের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত পচে যায়। কারণ দূষিত বরফে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেশি থাকে। ফলে: মাছ নরম হয়ে যায়, দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, বাজারমূল্য কমে যায়। জীবাণুর কার্যকলাপে মাছের প্রোটিন নষ্ট হয়। দূষিত বরফ ব্যবহারে জেলেদের ক্ষতি, মাছ দ্রুত নষ্ট হয়, বাজারমূল্য কমে যায়, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি, ভোক্তার আস্থা কমে, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি, রপ্তানিযোগ্য মাছ মানহীন হয়ে পড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
কলাপাড়া উপজেলার প্রাক্তন স্বাস্থ্য প্রশাসক ডাঃ আব্দুর রহিম জানান, দূষিত পানির বরফে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা রাসায়নিক দূষক থাকতে পারে। বরফ গলে গেলে মাছের পৃষ্ঠে (ত্বক, ফুলকা ইত্যাদি) জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। খাদ্যবাহিত রোগ যেমন সালমোনেলোসিস, শিগেলোসিস, কলেরা, হেপাটাইটিস এ এবং নোরোভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ভারী ধাতু (সিসা, আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, পারদ) দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি হতে পারে। দূষিত পানির বরফে কলেরা, টাইফয়েড বা হেপাটাইটিস এ-এর জীবাণু বা ভাইরাস উপস্থিত থাকলে মাছ দূষিত হতে পারে এবং যথাযথভাবে রান্না না করা বা দূষিত অবস্থায় খেলে মানুষের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।"
এ ছাড়া দূষিত বরফে পরজীবীর ডিম বা সিস্ট থাকলে পরজীবী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। অন্যদিকে রাসায়নিক দূষক মাছের শরীরে জমে বিষক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। ভারী ধাতু মাছে স্থানান্তরিত বা জমা হতে পারে, যা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
এই চিকিৎসক আরো বলেন, ‘মাছের গায়ে ক্ষত বা কাটা অংশ থাকলে জীবাণু আরও দ্রুত প্রবেশ করতে পারে। তবে সাধারণভাবে দূষণ সবচেয়ে বেশি হয় মাছের বাইরের অংশে। তবে মূল বার্তা হচ্ছে, দূষিত বরফ মাছ রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য খুবই ঝুকিপূর্ণ।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘অনিরাপদ বা দূষিত পানির তৈরি বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে মাছ রোগজীবাণু, রাসায়নিক দূষক এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ দ্বারা দূষিত হতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে মাছের স্বাদ, গন্ধ, রং, পুষ্টিমান ও সংরক্ষণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। দূষিত বা অনিরাপদ বরফ ব্যবহার এর ফলে আহরিত মৎস্য এর আহরণ পরবর্তী ক্ষতি হয়. যার পরিমাণ প্রায় ৮%। তাছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ইতিমধ্যে নিরাপদ ও পানযোগ্য পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য উপজেলা প্রশাসন এর সহয়তায় মৎস্য অধিদপ্তর কার্যক্রম গ্রহন করেছে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মাছের গুণগত মান বজায় রাখতে নিরাপদ পানির তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত বরফ ব্যবহার নিশ্চিত