একসময় বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ ছিল ভোলা। স্থানীয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কারণে জেলার মানুষ তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করত। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ সেই ভোলাই দীর্ঘ লোডশেডিং, অনিশ্চিত সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। গ্যাসসমৃদ্ধ একটি জেলায় বিদ্যুতের জন্য মানুষের এমন দুর্ভোগ কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ঘাটতিরও প্রতিফলন। ভোলার ৩৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘদিন জেলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রধান ভরসা ছিল। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে অনাগ্রহের কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে বোরহানউদ্দিনের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করা হলেও বিকল ট্রান্সফরমার ও সীমিত সঞ্চালন সক্ষমতার কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভোলা নিজস্ব গ্যাস থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে অবদান রাখলেও জেলার নিজস্ব চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কম খরচের বিদ্যুতের সুবিধা জনগণ পাচ্ছে না, অথচ দেশের অন্যত্র উচ্চ ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি ন্যায্যতা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও। সমস্যার আরেকটি দিক হলো দীর্ঘসূত্রতা। ভোলা সদর গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও প্রকল্পটি বছরের পর বছর ফাইলবন্দি রয়েছে। একইভাবে সঞ্চালন লাইনের পাশে অপরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ এবং রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বয়হীনতার কারণে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। এসব সমস্যা নতুন নয়; কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ প্রয়োজনীয় গতিতে এগোয়নি। এ বাস্তবতায় দায় চাপানোর রাজনীতি নয়, কার্যকর সমাধানই হওয়া উচিত অগ্রাধিকার। বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত, বিকল ট্রান্সফরমারের বিকল্প ব্যবস্থা, সঞ্চালন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং ভোলা সদর গ্রিড সাবস্টেশন নির্মাণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে ভোলাবাসীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভোলার মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছে না; তারা চাইছে নিজেদের সম্পদ থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ন্যায্য সুবিধা। গ্যাসসমৃদ্ধ একটি জেলা যদি বিদ্যুতের সংকটে নাকাল হয়, তবে তা শুধু ভোলার নয়, জাতীয় পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন দ্রুত, সমন্বিত ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ-যাতে ভোলা আবার অন্ধকার নয়, উন্নয়ন ও সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।