দেশে আমের চাষ ও উৎপাদন বাড়লেও রফতানি না বাড়ায় আম চাষীরা হতাশ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
দেশে আমের চাষ ও উৎপাদন বাড়লেও রফতানি না বাড়ায় আম চাষীরা হতাশ

চলছে মধু মাস। এ সময়ে দেশে আম চাষ ও উৎপাদন বাড়লেও রফতানি না বাড়ায় চাষীরা হতাশ।দেশে দেশে আমকেন্দ্রিক শিল্পের প্রসার ঘটলেও বাংলাদেশ তার ধারে-কাছেও যেতে পারছে না। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় বিগত কয়েক বছর ধরেই উৎপাদিত হচ্ছে রফতানিযোগ্য বিপুল পরিমাণ আম। কিন্তু সরকারের বিদ্যমান নীতির কারণে বাড়ছে না রফতানি। ফলে রফতানি লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। আর দেশ থেকে যেটুকু আম রপ্তানি হয় তাতে উপকৃত হচ্ছেন না চাষীরা। বরং চাষীদের অভিযোগ, আম রফতানির পুরো মুনাফা যাচ্ছে ঢাকার রফতানি সিন্ডিকেটের পকেটে। ঢাকার সিন্ডিকেট চাষী পর্যায় থেকে আম না কিনে আড়ত থেকে আম কিনে বিদেশে পাঠাচ্ছে। ফলে মানসম্মত আম না যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে না বিদেশে বাংলাদেশি আমের বাজার। কৃষি বিভাগ এবং আম চাষীদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে প্রতিবছরই আম চাষ ও উৎপাদন বাড়ছে। বর্তমানে আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম রয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ রফতানি হচ্ছে না। ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশিও বাংলাদেশের আমের বাজার। আর রফতানি সহজ হলে তা ছাড়িয়ে যাবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানসম্মত ও নিরাপদ আম রফতানি বাড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশ  আম উৎপাদনকারী একটি শীর্ষ দেশ হওয়ার পরও ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা খুবই নগণ্য। অথচ উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর পর্যন্ত যথাযথ ব্যবস্থাপনা পরিপালন করলে আম রফতানি ব্যাপক হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে রফতানি হওয়া আমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মার্কেট শেয়ার মাত্র ১ শতাংশেরও কম।

সূত্র জানায়, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ৩৮টি দেশে বর্তমানে আম রফতানি হয়। আর রফতানিযোগ্য আম চাষীরা বাড়তি খরচ করে উৎপাদন করলেও তারা রফতারি সুযোগ পাচ্ছে না। চলতি বছরও দেশ থেকে আম রফতানির অর্ধেক লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। দেশে এ বছরও ৩০ হাজার টন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু তার বিপরীতে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা মাত্র ৫ হাজার টন। বিগত ২০১৬-১৭ মৌসুমে আম রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৯ টন। তার পাঁচ বছর পর আম রফতানির পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ৭৬৭ টন হয়। ২০২২-২৩ মৌসুমে বিদেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১০০ টন আম যায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আম রফতানি কমে ১ হাজার ৩২১ টন দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারণ করা হলেও ২ হাজার ১২১ টন রফতানি হয়। যদিও বিগত কয়েক বছর ধরেই আম রফতানিতে উৎসাহদানে রফতিিানযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প নামের একটি প্রকল্প চলছে। ওই প্রকল্পের আওতায় রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে চাষীদের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনা এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। প্রকল্পের আওতায় উত্তম কৃষিচর্চা বা গ্যাপ নামের কর্মসূচি আছে। তার আওতায় আম উৎপাদন, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কলাকৌশল চাষিদের শিক্ষা দেয়া হয়। তাছাড়া চাষীদের সঙ্গে রপ্তানিকারকদের সংযোগ স্থাপন ও সহায়তা প্রদান করা হয়। কিন্তু তারপরও রফতানিতে অর্জিত হচ্ছে না লক্ষ্যমাত্রা।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০২৪-২৫ মৌসুমে দুই লাখ ৫ হাজার ২০৫ হেক্টর বাগান থেকে ২৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৮৩ টন আম উৎপাদন হয়। কিন্তু ২০২৫-২৬ মৌসুমে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৭ মেট্রিক টনে। আর চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯৮ টন। তার আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৮ টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। বিদেশে বাংলাদেশের আমের বিপুল চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আম রফতানির ক্ষেত্রে বাগান থেকে ফল সংগ্রহ, নির্দিষ্ট মানে সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহণ সুবিধা গড়ে ওঠেনি এখনো। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবারও দেশের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী জেলা। সেখানে ৩৭ হাজার ৪৯৮ হেক্টর বাগান থেকে ৪ লাখ ৬৯ হাজার টন আম উৎপাদন হচ্ছে। ওই জেলা থেকে এবার ২৫০ টন আম বিদেশে যাবে। তাছাড়া আম উৎপাদনে পার্শ্ববর্তী জেলা নওগাঁ এগিয়ে যাচ্ছে। নওগাঁর ৩০ হাজার ৩২১ হেক্টর বাগানে এবার ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন আম ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আর নওগাঁ থেকে এবার বিদেশে যাবে ১০০ টন আম। বিগত কয়েক বছরে নওগাঁ থেকে ২৫০ টন পর্যন্ত আম বিদেশে গেছে। এবার রাজশাহীর ১৯ হাজার ৪৬২ হেক্টর বাগান থেকে ২ লাখ ৫৬ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। 

এদিকে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনকারী চাষীদের মতে, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাগান থেকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ঢাকায় আম পাঠাতে শীতাতপ ভ্যানের অভাব ও বিপুল পরিবহণ খরচ আম রফতানির ক্ষেত্রে বড় বাধা। বাগান থেকে ঢাকায় ও বিদেশ পর্যন্ত প্রায় ৮৫০ টাকা এক কেজি আমের পরিবহণ খরচ পড়ে। সেক্ষেত্রে চাষীরা রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও রফতানির সব ধাপ অতিক্রম করা তাদের পক্ষে কঠিন। রফতানি বাড়াতে হলে সবকিছুই সহজ করতে হবে। মূলত আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন সুবিধার অভাব, গ্যাপ সনদের স্বল্পতা, উন্নত প্যাকেজিং, প্রমিতকরণ ও পর্যায়িতকরণ ব্যবস্থার ঘাটতি, উচ্চ পরিবহণ ব্যয় এবং ফাইটোস্যানিটারি শর্ত পূরণের জটিলতাই বাংলাদেশের আম রফতানিতে বড় বাধা।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে রাজশাহী আঞ্চলিক ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. রিদওয়ানুল কারিম জানান, আম রফতানির ক্ষেত্রে নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রয়েছে। রফতানি আমে দাগ না থাকা ও সঠিক কৌশলে ফ্রুট ব্যাগিং করা প্রয়োজন। আমে পোকা থাকা চলবে না। আমকে থার্মাল হাউজে জীবাণুমুক্ত করারও দরকার পড়ে। গ্যাপ (গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্রাকটিস) সনদ লাগে। কিন্তু চাষীরা ওসব ঝামেলা পোহাতে পারেন না। সেক্ষেত্রে আমপ্রধান এলাকায় রফতানি উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি। সর্বোপরি সরকারি সহায়তাও খুব প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক পাপিয়া রহমান জানান, রাজশাহীতে আমের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হবে। কিছু আম রফতানিও হবে। নাটোরেও আম চাষ বাড়ছে। ওই জেলার ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টরে ৬৮ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উৎপাদন আরো বেশি হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে