সৌরসেচে কৃষির ভবিষ্যৎ

সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি

এফএনএস
| আপডেট: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম | প্রকাশ: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয় জরুরি

দেশের কৃষি খাতকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটমুক্ত করতে সেচব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে সৌরশক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থার পথও সুগম হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি। পত্রপত্রিকার তথ্যনুযায়, দেশে বর্তমানে ১৭ লাখের বেশি সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, যার বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। এসব পাম্প পরিচালনায় বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার জ্বালানি ব্যয় হয়। সৌরশক্তির ব্যবহার সেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং অফ-সিজনে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগও তৈরি হবে। কৃষি ও জ্বালানি-দুই খাতেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদ্যমান অনেক সৌর সেচপাম্প কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারেনি। মেঘলা আবহাওয়া, পর্যাপ্ত ব্যাটারি ব্যাকআপের অভাব, রাতের সেচে সীমাবদ্ধতা এবং সারফেস ওয়াটারের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা ব্যাহত করেছে। কৃষকের জন্য সেচ কোনো পরীক্ষামূলক বিষয় নয়; এটি ফসল উৎপাদনের জীবনরেখা। তাই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে মাঠের বাস্তবতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কৃষকেরা সৌরশক্তির বিরোধিতা করছেন না; বরং তারা নিরবচ্ছিন্ন সেচ নিশ্চিত করার জন্য বিকল্প বা ব্যাকআপ ব্যবস্থার দাবি তুলছেন। এই দাবি অযৌক্তিক নয়। কারণ বোরো মৌসুমে কয়েক ঘণ্টার সেচ ব্যাহত হলেও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে শতভাগ সৌরনির্ভরতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি, হাইব্রিড ব্যবস্থা এবং গভীর নলকূপের উপযোগিতা বিবেচনায় নিতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রক্ষণাবেক্ষণ। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে তা মেরামতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। ফলে ব্যয়বহুল প্রকল্প থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন কৃষকরা। তাই অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি দক্ষতা, দ্রুত সেবা এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। সৌরসেচ বাংলাদেশের কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে এই রূপান্তর যেন কেবল অবকাঠামো স্থাপনের প্রকল্প না হয়ে কৃষকের বাস্তব চাহিদাভিত্তিক টেকসই উদ্যোগে পরিণত হয়, সেদিকেই এখন সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তি, পরিকল্পনা এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে সঠিক সমন্বয়ের ওপর।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে