ধ্বংসস্তূপে আরও বহুজন আটকে থাকার আশঙ্কা

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড কারাকাস, নিহত অন্তত ৩২

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | প্রকাশ: ২৫ জুন, ২০২৬, ১১:২১ এএম
ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড কারাকাস, নিহত অন্তত ৩২
ছবি: এএফপি

ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক শহরে ভবন ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিমানবন্দর ও আবাসিক এলাকা, বন্ধ করা হয়েছে গ্যাস সরবরাহের অংশবিশেষ। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ভোর পর্যন্ত দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত ৩২ জন নিহত এবং ৭০০ জন আহত হয়েছেন। তবে উদ্ধারকাজ এখনও চলছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৭ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে আঘাত হানে। এর ১ মিনিটেরও কম সময় পর আসে আরও শক্তিশালী ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি কম্পন। একের পর এক এই দুই কম্পনে কারাকাস, লা গুইরা, মিরান্ডা, আরাগুয়া, কারাবোবো ও ফ্যালকন অঙ্গরাজ্যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, প্রধান দুটি ভূমিকম্পের পর অন্তত ২০টি আফটারশকও রেকর্ড করা হয়েছে।

কারাকাসের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন ধসে পড়েছে। আল জাজিরা জানায়, রাজধানীর বারুতা এলাকায় ধসে পড়া স্থাপনায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। চাকাও জেলায় চারটি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও অন্তত ৩০টি ভবন। আলতামিরা এলাকায় একটি ২২ তলা ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটি। উপকূলীয় ফ্যালকন রাজ্যেও একটি ভবন ধসে অন্তত ১৫ জন আটকে পড়েছেন বলে স্থানীয় গভর্নর ভিক্টর ক্লার্ক জানিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, “এটি গুরুতর পরিণতি ডেকে আনা একটি ঘটনা। রাজধানী কারাকাসের বিভিন্ন প্যারিশে ভবন ধসে পড়েছে। মিরান্ডা ও লা গুইরা অঙ্গরাজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তিনি বলেন, যেসব বাড়ি ও ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি গুরুতর, সেগুলো দ্রুত খালি করতে হবে। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

রয়টার্স বলছে, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কারাকাসের সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু এলাকায় গ্যাস সরবরাহও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসলাইন চালু করা হবে না, যাতে নতুন করে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

ঘটনার পরপরই রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসেন আতঙ্কিত বাসিন্দারা। আল জাজিরার প্রতিবেদনে কারাকাসের বাসিন্দা রবার্তো গামাস বলেন, “ভবনটা এক পাশ থেকে আরেক পাশে দুলছিল। শক্তিটা ছিল অবিশ্বাস্য। আমরা হাঁটছিলাম, কিন্তু কম্পনে ছিটকে যাচ্ছিলাম। ঘরের সবকিছু মেঝেতে পড়ে যায়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা বের হতে পেরেছি।” আরেক বাসিন্দা মারিয়া আলেহান্দ্রা রয়টার্সকে বলেন, নিচে নামার পর “দৃশ্যটা যেন একেবারে হরর মুভির মতো” ছিল।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব পাওয়া না গেলেও ইউএসজিএসের প্রাথমিক মডেল পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছে। সংস্থাটির পেজার মডেল অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে প্রাণহানি হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে, এমনকি ১০ হাজারের বেশি মৃত্যুও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউএসজিএসের হালনাগাদ বিশ্লেষণে ১ হাজার থেকে ১০ হাজার মৃত্যুর সম্ভাবনা ৩৯ শতাংশ এবং ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মৃত্যুর সম্ভাবনা ৩৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ক্ষতি ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের ১ থেকে ৪ শতাংশের সমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার অভিযান এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। ধসে পড়া ভবনের নিচে জীবিতদের খুঁজতে কাজ করছে উদ্ধারকর্মীরা। আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাবও আসতে শুরু করেছে। রয়টার্স ও আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দুর্যোগ সহায়তা দল ও টাস্কফোর্স প্রস্তুত করেছে। দেশটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সামগ্রী এবং মানবিক সহায়তা পাঠানোর কথাও জানিয়েছে। ব্রাজিল, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, পানামা ও ইকুয়েডরও সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ইতিহাস নতুন নয়। আল জাজিরার তথ্যমতে, ১৯৬৭ সালে কারাকাসের কাছে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে অন্তত ২২৫ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে দেশটির উত্তর উপকূলে ৭ দশমিক ২ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পেও ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। তবে এবারের জোড়া ভূমিকম্পের ধাক্কা রাজধানী ও আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে একসঙ্গে আঘাত হানায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, ততই সামনে আসবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। আপাতত ভেনেজুয়েলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং আফটারশকের ঝুঁকির মধ্যে নগরজীবনকে নিরাপদ রাখা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে