রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, মব সহিংসতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, পুলিশের ওপর হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। দৈনিক প্রকাশিত খবরাখবর থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে সামনে এসেছে। এসব পরিসংখ্যান শুধু অপরাধ বৃদ্ধির চিত্রই তুলে ধরে না, বরং সমাজে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি কতটা গভীর হচ্ছে, তাও নির্দেশ করে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সংস্কৃতির বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, অপরাধের অভিযোগ উঠলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ না করে অনেক ক্ষেত্রে জনতা নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। এটি শুধু আইনের শাসনের পরিপন্থী নয়, বরং একটি সভ্য সমাজের জন্য বিপজ্জনক প্রবণতা। বিচারহীনতার আশঙ্কা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা মানুষকে এমন পথে ঠেলে দিতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা ও মনোবল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশের ওপর আস্থার সংকট, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখনো এক হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়া ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে থেকে গেলে সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তবে সমস্যার সমাধান শুধু কঠোর অভিযান বা গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধের সামাজিক ও রাজনৈতিক উৎস চিহ্নিত করা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা, সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও আস্থা ফিরিয়ে দেওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং, মাদক বিস্তার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের মতো কারণগুলোর প্রতিও সমন্বিত দৃষ্টি দিতে হবে। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন অপরাধী তার পরিচয় বা প্রভাব নির্বিশেষে বিচারের মুখোমুখি হয় এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থার সমন্বিত ও দৃশ্যমান উদ্যোগই পারে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে এবং আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করতে।