নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় চুরির অভিযোগে এক কিশোরকে জনসম্মুখে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অমানবিক ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনাটি সোমবার (২৯ জুন) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও বাজারের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ঘটে। পরে একই দিন বিকেলে ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) মূল অভিযুক্ত গ্রাম পুলিশ সদস্য রতন রবি দাশকে আটক করে পুলিশ। একই সঙ্গে তাকে গ্রাম পুলিশ পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী কিশোর মো. রাব্বিল (১৪) কলমাকান্দা উপজেলার বানাইকোনা গ্রামের মো. রফিকুল ইসলামের ছেলে। আটক রতন রবি দাশ উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামের বিন্দু রবি দাশের ছেলে। তিনি গ্রাম পুলিশ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে একটি সেলুন পরিচালনা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচগাঁও বাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে চুরির ঘটনায় রাব্বিলের বিরুদ্ধে সাত হাজার টাকা চুরির অভিযোগ ওঠে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে তল্লাশি চালিয়ে ওই টাকা উদ্ধার করেছে বলে দাবি করা হয়। উপস্থিত লোকজনের সামনে কিশোরটি চুরির বিষয়টি স্বীকারও করে।
কিন্তু তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় কয়েকজনের উপস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ সদস্য রতন রবি দাশ আইন নিজের হাতে তুলে নেন। শাস্তির নামে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই জনসম্মুখে কিশোরটির মাথা সম্পূর্ণ ন্যাড়া করে দেওয়া হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, চুল কাটার সময় কিশোরটি বারবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে ‘কাকু’ ও ‘মামু’ বলে ডেকে ক্ষমা চাইছে। ভবিষ্যতে আর এমন কাজ করবে না বলেও আকুতি জানাচ্ছে। কিন্তু উপস্থিত কেউ তার আর্তনাদে সাড়া দেয়নি। বরং পুরো ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
আটকের পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে রতন রবি দাশ বলেন, “পাঁচগাঁও বাজারে লোকজন কিশোরটিকে আটক করে আমাকে খবর দেয়। আমি সেখানে গেলে উপস্থিত লোকজন একশো টাকার বিনিময়ে তার মাথা ন্যাড়া করে দিতে বলে। আমি তা করেছি। এখন আমি আমার কাজের জন্য অনুতপ্ত।”
রংছাতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান পাঠান বাবুল জানান, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর তিনি অভিযুক্তকে পরিষদের গ্রাম পুলিশ সদস্য হিসেবে শনাক্ত করেন। এরপর বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানা পুলিশকে জানানো হলে দ্রুত তাকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক (তদন্ত) সজল সরকার বলেন, চুরির অভিযোগে কিশোরকে নির্যাতনের ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মিকাইল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
আইন রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন গ্রাম পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একজন কিশোরকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছে, এমন অমানবিক ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।