২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জাহাজভাঙা শিল্পে ২৮টি দুর্ঘটনায় ৩ শ্রমিক নিহত, ১০ জন গুরুতর আহত এবং ১৫ জন মাঝারি আহত হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এপ্রিলে। প্রায় ৮০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন-হুক-ওয়্যারজনিত সমস্যা এবং গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে। এই চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অবদান সত্ত্বেও শ্রমিকদের জীবন এখনও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জাহাজভাঙা শিল্প সেক্টরের অর্ধবার্ষিক দুর্ঘটনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, কাটারম্যান, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ ও লোডিং গ্রুপের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কাজ করেন। দুর্ঘটনার পেছনে অনিরাপদ আচরণ, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যেমন ঐড়হম কড়হম ঈড়হাবহঃরড়হ, ওখঙ এঁরফবষরহবং এবং ইধংবষ ঈড়হাবহঃরড়হ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পিপিইর বাধ্যতামূলক ব্যবহার, গ্যাস টেস্ট, পারমিট টু ওয়ার্ক, নিরাপদ ক্রেন পরিচালনা, নিয়মিত টুলবক্স মিটিং এবং জরুরি মহড়ার মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। আমাদের মতে, জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু শ্রমিকের অধিকার নয়, বরং শিল্পের টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। প্রতিটি দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য, যদি মালিক, শ্রমিক ও সরকার একসঙ্গে কাজ করে। এজন্য শ্রমিকদের নিয়মিত নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকি রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ এবং প্রতিটি দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মালিক ও সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কার্যকর তদারকি এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা প্রদর্শনের। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন। শুধু দুর্ঘটনা প্রতিরোধ নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পের অর্থনৈতিক অবদানকে টেকসই রাখতে হলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, শিল্পে আস্থা ফিরবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। আমাদের প্রত্যাশা, জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন সমন্বিত উদ্যোগ নেবে। প্রতিটি শ্রমিকের জীবন সুরক্ষিত না হলে শিল্পের উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না।