দেশজুেেড়ই বাড়ছে মৌসুমী জ্বরের প্রকোপ। দিন দিন তা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। অনেক রোগীর জ্বর স্থায়ী হচ্ছে ৫ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত। ডেঙ্গুর এনএস১, আইজিএম কিংবা টাইফয়েড পরীক্ষায় রোগ ধরা না পড়লেও রোগীরা ভুগছেন দুর্বলতা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমি, ডায়রিয়া এবং রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মতো সমস্যায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ডেঙ্গু ও টাইফয়েডের বাইরে অন্য কোনো সংক্রামক রোগ, বিশেষ করে ম্যালেরিয়া বা অন্যান্য ভাইরাসজনিত জ্বর ছড়িয়ে পড়ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। কিন্তু অনেক রোগীর ডেঙ্গু ও টাইফয়েড পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও দীর্ঘদিন ধরে জ্বর কমছে না। বরং কেউ কেউ নিউমোনিয়া, রক্তে সংক্রমণ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বরের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ১৩টি জেলায় প্রধানত ম্যালেরিয়া বেশি দেখা যায়। যদিও দেশের এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মানুষের চলাচল বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরন বদল এবং মশার বিস্তারের কারণে ম্যালেরিয়ার বিস্তার ঘাঁর আশঙ্কা থাকে। বর্তমানে দেশে ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে মূলত র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (আরডিটি) ব্যবহার করা হয়। প্রয়োজন হলে রক্তের স্লাইড প্রস্তুত করে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে পরজীবী শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। যদিও দেশে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মাইক্রোস্কোপভিত্তিক দক্ষতা ও অবকাঠামোর ব্যবহারও কমে এসেছে। আরডিটি পরীক্ষাগুলো প্রধানত প্লাজমোডিয়াম ফালসিপারাম ও প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স শনাক্ত করার জন্য তৈরি। কারণ দেশে ম্যালেরিয়ার অধিকাংশ সংক্রমণ ওই দুই প্রজাতির মাধ্যমেই ঘটে। অতীতে প্লাজমোডিয়াম ম্যালেরিয়া ও প্লাজমোডিয়াম ওভালে এর সংক্রমণও পাওয়া গেছে। তবে সংখ্যা কম হওয়ায় সেগুলো খুব একটা নিয়মিত পরীক্ষার আওতায় আসিনি।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের কয়েকটি বেসরকারি ব্লাডব্যাংকে সমপ্রতি রক্তদাতা স্ক্রিনিংয়ের সময় ম্যালেরিয়া পজিটিভ দাতা শনাক্ত হয়েছে। অথচ তাদের কারোর মধ্যেই রোগের দৃশ্যমান উপসর্গ ছিল না। অর্থাৎ উপসর্গবিহীন সংক্রমণ এখনো সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। নীরবে বিদ্যমান থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ম্যালেরিয়ার বড় আকারের প্রাদুর্ভাব না থাকার কারণে চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই অন্য রোগের দিকে চলে গেছে বেশি।
সূত্র আরো জানায়, জ্বরকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। জ্বরের রোগীকে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে এবং বিশ্রামে থাকতে হবে। আর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে বা কোনো বিপৎসংকেত (শ্বাসকষ্ট, তন্দ্রাচ্ছন্নতা, খিঁচুনি, খেতে না পারা, প্রস্রাব কমে যাওয়া,গায়ে দানা) দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। বর্তমানে দেশের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো রয়েছে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি। জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি, ঘাম হওয়া, দুর্বলতা বা ভ্রমণের ইতিহাস থাকলে ম্যালেরিয়ার কথাও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। ম্যালেরিয়া সন্দেহ হলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ দেরি হলে তা গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার জানান, সব জ্বর ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের কারণে হয় না। বিভিন্ন ভাইরাল সংক্রমণ, ম্যালেরিয়া, স্ক্রাব টাইফাস, রিকেটশিয়াল ফিভার, লেপ্টোস্পাইরোসিস, নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস কিংবা রক্তে সংক্রমণ (সেপসিস) থেকেও গুরুতর জ্বর হতে পারে। অনেক সময় রোগের শুরুতে কিছু পরীক্ষার ফল নেগেটিভও আসতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অচেতনতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি।