পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষ

পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে প্লাবিত চকরিয়া-মাতামুহুরী ও পেকুয়া

এফএনএস (বলরাম দাশ অনুপম; কক্সবাজার) : | প্রকাশ: ৯ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে প্লাবিত চকরিয়া-মাতামুহুরী ও পেকুয়া

চার দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দুই উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। 

মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে নদীর পানি। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সরে গিয়ে চকরিয়া উপজেলা বরইতলী ইউনিয়নে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।  নিহতরা হলেন- নিহত দুই শিশুর নাম রুমি আক্তার (১৫)। সে বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়া কাটা গ্রামের মোহাম্মদ কাজলের কন্যা এবং বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেনীর শিক্ষার্থী। 

অপর শিশুর নাম মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। সে আবদুল মজিদের পুত্র এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। নিহতরা সম্পর্কে আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাই-বোন।  বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন- একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে লোকজনের মাঝে। গত দুইদিন ধরে পানিতে তলিয়ে রয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। এই অবস্থায় পাহাড় ধ্বসে দুইজন শিশুর অকালে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

জানা গেছে, চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমু বিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিংগা, বরইতলী, হারবাং এবং নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর, সাহারবিল ইউনিয়নের নিচু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। 

এদিকে, পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌরসভা এলাকাও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, অনেক ফসলি জমি, চিংড়ির ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। টানা ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় দুই উপজেলার পাহাড়ি এলাকার পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশয়ে সরে যেতে প্রশাসন মাইকিং করছে। 

চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা এডভোকেট মঈনুল আমিন বলেন, চার দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হয়। রাস্তাঘাটে পানির নিচে থাকায় চলাচল খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের কৃষক সৈয়দ আলম বলেন,আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে। চকরিয়া পৌরসভার রিকশাচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম। সারাদিন রিকশা চালিয়েও ঠিকমতো আয় হচ্ছে না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চকরিয়া পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কেউ রান্নাবান্না করতে পারছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে। আমি নিজেও পানিবন্দী হয়ে পড়েছি। তারপরও চেষ্টা করছি এলাকার বন্যা কবলিত মানুষদের সাহায্য করতে।  মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিত সম্পাদক সোয়াইবুল ইসলাম সবুজ বলেন, চার দিনের টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদ সীমার উপরে রয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে কোণাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। এতে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করছে। আমরা বন্যা কবলিত মানুষদের খোঁজ-খবর নিচ্ছি। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীদ দেলোয়ার বলেন, টানা ভারী বর্ষণ ও  পাহাড়ে ঢলের পানিতে মাতামুহুরীর নদীতে পানি বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। স্ব-স্ব ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। উজানের পানি যাতে দ্রুত ভাটির দিকে নেমে যেতে পারে সেজন্য উপকূলীয় ইউনিয়ন গুলোর পানি নিষ্কাশনের -্লইস গেটগুলোর কপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, মাতামুহুরী নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। দুপুর  দুপুর ১২টা পর্যন্ত নদীর পানি বিপদসীমা ১১.৮০ মিটার অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে