১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসন, কিশোরগঞ্জের উদ্যোগে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। দিনের সূচনায় সকাল ৯:০০ ঘটিকায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে জুলাই শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন-এর সভাপতিত্বে জুলাই শহীদ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এক স্মরণসভা ও আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জুলাই শহীদদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে অংশগ্রহণ করেন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ, জুলাই যোদ্ধাগণ,বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আলোচনা পর্বে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাঁদের স্বজন হারানোর বেদনাময় স্মৃতি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জুলাই যোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং অন্যান্য বক্তারা জুলাই আন্দোলনের তাৎপর্য, শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগ এবং বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাঁদের অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং তাঁদের আদর্শ আগামী প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবে। তিনি জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয় তুলে ধরে তাঁদের সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের আন্তরিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
জুলাই শহিদ দিবস ২০২৬ পালন উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে
আলোচনা সভার শুরুতে সকল শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দাড়িয়ে ১ মিনিট নিরবতা পালন করেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো: ইশতিয়াক ইমনের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা জুলাই আহতদের দ্রুত সুস্থতা এবং শহিদ পরিবারের প্রতি সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের চেতনা সমুন্নত রেখে ন্যায়বিচার, সুশাসন, শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জুলাই শহিদ সিফাত উল্লাহর পিতা তাঁর বক্তব্যে সকল শহিদ পরিবারের জন্য দোয়া কামনা করেন। তিনি জুলাই শহিদদের আত্মত্যাগের আদর্শ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
জুলাই শহিদ তরিকুল ইসলাম রুবেলের ভাই আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।
শহিদ মোবারক হোসেনের ছোট ভাই আবেগঘন বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি শহিদ পরিবারগুলোর প্রতি সব ধরনের হয়রানি বন্ধ এবং তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
শহিদ মেহেদীর মা বলেন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ছেলেকে বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েও শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তিনি তাঁর সন্তানের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
শহিদ সোহেলের এক নিকটাত্মীয় বলেন, তৎকালীন পরিস্থিতিতে শহিদ সোহেলের জানাজা অনুষ্ঠানও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছিল। তিনি জুলাই শহিদ পরিবারের যথাযথ মর্যাদা, সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কিশোরগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল মালেক চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের সময় তাঁর প্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা পারসন নাঈম গুলিবিদ্ধ হন। তিনি জুলাই শহিদ পরিবার এবং আহতদের যেকোনো দুর্যোগে পাশে থাকার জন্য সমাজের সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
কিশোরগঞ্জ গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অভি চৌধুরী নিহত শহিদদের রুহের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেন। তিনি শহিদ ও আহত পরিবারের কল্যাণে বর্তমান প্রশাসন ও সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ইকরাম হোসেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সরকারি সেবা প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন দিলু বলেন জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ ও দায়িত্বশীল রাজনীতির খুবই প্রয়োজন । জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাজী ইসরাফিল মিয়া জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে শহিদ সোহেলের নামে একটি সড়কের নামকরণের দাবি জানান। তিনি বলেন, শহিদ পরিবারের কল্যাণে বর্তমান সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা করেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা জুলাই গণ-আন্দোলনের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহিদ ও আহত পরিবারের মর্যাদা, ন্যায়বিচার, পুনর্বাসন এবং সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) নাজমুস সাকিব খান, পিপিএম বলেন, জুলাই গণ-আন্দোলনের শহিদদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশ শহিদ ও আহত পরিবারের বেদনা গভীরভাবে অনুভব করে এবং তাদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শহিদ পরিবার ও আহতদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশ সর্বদা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মোঃ নাজমুল করিম তাঁর বক্তব্যে জুলাই গণ-আন্দোলনের সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি শহিদ পরিবারের সদস্য, আন্দোলনে আহত ব্যক্তি এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সকলের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করেন। তিনি বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সভার সমাপনী বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জুলাই গণ-আন্দোলনের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি শহিদ পরিবার ও আহতদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশাসনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি সকলকে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে দেশের উন্নয়ন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। পরিশেষে তিনি উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।