ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে আবারও যন্তর মন্তরে জড়ো হয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে সোমবার ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে হাজারো শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকার পরও বিক্ষোভকারীদের বিশাল একটি অংশ সংসদ ভবনের খুব কাছে পৌঁছে যায়। একপর্যায়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিচার্জ করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতৃত্বহীন এই বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যান। প্রথম দিকে পুলিশ তাঁদের তেমন বাধা দেয়নি। একপর্যায়ে সংসদ ভবন থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে বাস আড়াআড়ি করে রেখে তাঁদের আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যেতে থাকেন।
বিক্ষোভের সূত্রপাত সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ থেকে। এর জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের ডাক দেয় সিজেপি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো গুরুতর ঘটনায় সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে।
সোমবারের সংঘর্ষে ১০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে আন্দোলনকারীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে।
এদিকে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার মধ্যে সোমবার কেন্দ্রীয় সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে আন্দোলনকারীদের তিনটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে চলাচলে কোনো বিধিনিষেধ ছাড়া মুক্তি দেওয়া, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং নিট ২০২৬-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
বৈঠক শেষে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, মন্ত্রী তাঁদের দাবিগুলো যথাযথ পর্যায়ে আলোচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। তাই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
এনডিটিভি জানিয়েছে, সোমবারের সংঘর্ষের পর পুলিশ যন্তর মন্তর থেকে আন্দোলনের মঞ্চ ও তাঁবু সরিয়ে নেয়। কিন্তু মঙ্গলবার ভোর থেকেই আবার সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যন্তর মন্তর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করেছে সোনম ওয়াংচুকের অনশন। ১৮ জুলাই তাঁকে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর তিনি দিল্লির একটি হাসপাতালে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। ওয়াংচুক জানিয়েছেন, তরুণ আন্দোলনকারীদের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত অথবা সংসদ সদস্যরা হাসপাতালে এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করা পর্যন্ত তিনি অনশন চালিয়ে যাবেন।
সোমবারের বিক্ষোভে দিল্লির বাইরে থেকেও বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে রাজস্থানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আন্দোলনকারীরা দিল্লিতে আসেন। উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসা এক পুলিশ চাকরিপ্রত্যাশী বলেন, “প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।”
এদিকে আন্দোলন ঘিরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যেও দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়। বিক্ষোভকারীরা সংসদের এত কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আলোচনার পথ বেছে নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দ্য হিন্দু জানিয়েছে।
মঙ্গলবারও যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের ফিরে আসায় দিল্লির পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানেই রয়েছে সিজেপি।