একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র না থাকায় দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন কক্সবাজারে বছরের পর বছর ধরে সংকট চলে আসছিল। সাগরে জীবন বাজি রেখে ধরা বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সামুদ্রিক মাছ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খালাস করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, খোলা আকাশে রোদে-বৃষ্টিতে এবং নোংরা পরিবেশে মাছের গুণগত মান দ্রুত নষ্ট হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক অবতরণ সুবিধার অভাবে সামুদ্রিক মাছের একটি বিশাল অংশ বাজারজাতকরণের আগেই পচে যেত বা নষ্ট হতো, যা মৎস্য খাতে বিপুল পরিমাণ সংগ্রহোত্তর ক্ষতি (চড়ংঃ-যধৎাবংঃ ষড়ংং) তৈরি করত। এই অবকাঠামোগত শূন্যতার কারণে একদিকে সাধারণ জেলেরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হতেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট ও অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ দূর করতেই পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরে এখন নির্মিত হচ্ছে এক যুগান্তকারী ও আধুনিক সমাধান। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে এখানে নির্মিত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ‘মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র’। ২০২৪ সালে এই প্রকল্পের অনুদান চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক নির্মাণ কাজ শুরু হয়, যা আগামী ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ও সনাতন অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে এই আধুনিক কেন্দ্রটি চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সাথে জড়িত প্রায় ২ লাখ জেলে, ট্রলার মালিক, শ্রমিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী সরাসরি সুফল পাবেন, যা বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমিতে এক নতুন গতি সঞ্চার করবে। কক্সবাজারের মৎস্য খাত দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত মাছ খালাস, ছোট জেটি এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে এক প্রকার পঙ্গুত্বের মধ্যে ছিল। গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারগুলো যখন বিপুল পরিমাণ মাছ নিয়ে তীরে ফিরত, তখন পর্যাপ্ত জেটি না থাকায় বড় ট্রলারগুলো সরাসরি ঘাটে ভিড়তে পারত না। ফলে বাধ্য হয়ে ছোট ছোট নৌকার মাধ্যমে মাছ খালাস করে তীরে আনতে হতো, যা অনেক সময় অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে নদীগর্ভে দুর্ঘটনার শিকার হতো এবং ব্যবসায়ীদের চরম আর্থিক লোকসানে ফেলত। আগের পন্টুন ও অবকাঠামো ছিল ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক সময় ঠিকভাবে মাছ ল্যান্ডিং করা সম্ভব হতো না এবং পচনশীল এই পণ্যটি দ্রুত বাজারজাত করতে না পেরে এক ধরনের জিম্মিদশার মধ্যে দিন কাটাতেন মৎস্যজীবীরা। নতুন এই আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মৎস্যজীবীদের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার এক চমৎকার একছত্র সমাধান বা ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। বর্তমানে যেখানে এই ঘাটে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি মাছ ধরার ট্রলার মাছ খালাস করতে পারে, সেখানে নতুন কেন্দ্রটি চালু হলে দৈনিক একযোগে ৬০টি ট্রলার মাছ খালাসের সক্ষমতা অর্জন করবে। সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসবে সময়ের অপচয় রোধের মাধ্যমে; বর্তমানে ট্রলার থেকে মাছ খালাস ও পরিবহনের পেছনে যে ৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়, আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় তা নেমে আসবে মাত্র ২ ঘণ্টায়। ইতোমধ্যে নদীর তীরে টেকসই বাঁধ নির্মাণসহ স্টিলের ২টি জেটি, ২টি পন্টুন ও ২টি গ্যাংওয়ের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রতিদিন প্রায় দেড়শ শ্রমিক মূল ৩ তলা ভবনের নির্মাণযজ্ঞ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। মাছের তাজা ভাব ধরে রাখা এবং সংগ্রহোত্তর ক্ষতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে যুক্ত হচ্ছে বিশ্বমানের ফ্রিজিং প্ল্যান্ট ও কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা। এর ফলে মাছ শিকারের পর তা বিক্রি না হলেও নষ্ট হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকবে না এবং ব্যবসায়ীরা সঠিক সময়ে সঠিক মূল্যে তা বাজারজাত করতে পারবেন। মৎস্য খালাস ও বাজারের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখানে আধুনিক মাছ হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম যেমন- মাছ ধোয়ার বিশেষ বেসিন, কন্টেইনার, বাছাই ট্রে, ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র এবং উচ্চচাপ সম্পন্ন ওয়াশার সরবরাহ করা হচ্ছে। এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর ছোঁয়ায় মাছের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অক্ষুণ্ণ থাকবে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে সামুদ্রিক মাছ রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দেবে। ব্যবসায়িক সুবিধার পাশাপাশি এই প্রকল্পটিতে মৎস্য শ্রমিক ও জেলেদের মানবিক ও সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার এক অভূতপূর্ব রূপরেখা রাখা হয়েছে। এই বিশাল চত্বরে নির্মাণ করা হচ্ছে সুপরিসর ট্রাক টার্মিনাল, ব্যবসায়ীদের জন্য আধুনিক অফিস কক্ষ, কনফারেন্স রুম, নামাজ ঘর, পাবলিক টয়লেট এবং আধুনিক বর্জ্য নিষ্কাশন কেন্দ্র বা গার্বেজ ডিপো। সাগরে যাওয়া মাছ ধরার নৌযানের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের দোকানসহ একটি পূর্ণাঙ্গ বাজার ব্যবস্থা যেমন এখানে থাকবে, তেমনি মৎস্যজীবী ও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য থাকবে আধুনিক বিশ্রামাগার, ক্যান্টিন ও বিনোদন সুবিধা। দুর্যোগকালীন সময়ে মাছের মজুত সুরক্ষার বিশেষ ব্যবস্থার পাশাপাশি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি কক্সবাজারের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং মৎস্য খাতকে একটি আধুনিক ও লাভজনক শিল্প হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করবে।