দক্ষ শিক্ষকের অভাবে দেশে তৈরি হচ্ছে অদক্ষ চিকিৎসক

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম | প্রকাশ: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম
দক্ষ শিক্ষকের অভাবে দেশে তৈরি হচ্ছে অদক্ষ চিকিৎসক

দক্ষ শিক্ষকের অভাবে দেশে তৈরি হচ্ছে অদক্ষ চিকিৎসক। কারণ ওই চিকিৎসকরা হাতে-কলমে উপযুক্ত শিক্ষা পাচ্ছে না। কিন্তু ডাক্তারি পড়ে ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে। দেশের অনেক মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরই এমন অবস্থা। ফলে কর্মজীবনে তারা মানুষকে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দিতে পারছে না। কারণ তারা নিজেরাই শেখেননি অনেক কিছু। মূলত মেডিকেল কলেজগুলোতে দক্ষ শিক্ষক না থাকার কারণেই দক্ষ চিকিৎসক তৈরি হচ্ছে না। আবার দক্ষ চিকিৎসক না হলে ভবিষ্যতে দক্ষ শিক্ষকও তৈরি হবে না। ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপর সরাসরি তার প্রভাব পড়বে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজে মাত্র একজন ফরেনসিক অধ্যাপক রয়েছেন। তাছাড়া ওসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকও নেই। পাশাপাশি অবকাঠামোসহ নানা সংকটে দেশের পুরনো মেডিকেল কলেজগুলোই চলছে না। কিন্তু সেখানে নতুন করে আরো ৬টি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদনের পরিকল্পনা চলছে। বর্তমানে সুনামগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোনো শিক্ষণ হাসপাতাল নেই। বরং ক্লিনিক্যাল ক্লাস করতে সপ্তাহে দুদিন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়। অর্থাৎ হাতে-কলমে চিকিৎসাশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ধার করা অবকাঠামোয় চলছে। ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একাধিকবার আন্দোলন করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। অথচ এক বছরের মধ্যে হাসপাতাল চালুর আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। তাছাড়া নেত্রকোনা, নওগাঁ, নীলফামারী, মাগুরা, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও রাঙামাটিতে প্রতিষ্ঠিত ৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পরও নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল পায়নি। আর কক্সবাজার, পাবনা, যশোরসহ আরো কয়েকটি কলেজও হাসপাতাল সংকটে রয়েছে। অনেক কলেজ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা পুরনো ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। 

সূত্র জানায়, শিক্ষক সংকটের কারণে দেশে প্রকৃত চিকিৎসা শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে শূন্যপ্রায় অর্ধেক শিক্ষক পদ। আর মৌলিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সংকট আরো ভয়াবহ। ফরেনসিক মেডিসিনে দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের জন্য অধ্যাপক আছেন মাত্র একজন। পাশাপাশি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জন্য স্বীকৃত ও বাধ্যতামূলক কন্টিনিউয়িং মেডিক্যাল এডুকেশন ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেক চিকিৎসককে নতুন ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যা ঝুঁকিপূর্ণ। আর ফরেনসিক মেডিসিন দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু চিকিৎসা শিক্ষা নয়, বিচারব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার মান কমে গেলে মানুষ সঠিক বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের জরুরি চিকিৎসা দক্ষতা গড় মানেরও নিচে।

সূত্র আরো জানায়, দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে মৌলিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ৭ হাজার ৩৬টি। তার মধ্যে তিন হাজার ৫২টি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ মোট পদের প্রায় ৪৩ শতাংশই খালি। আর ৮টি মৌলিক বিষয়ে ২৫ শতাংশ এবং ক্লিনিক্যাল বিষয়ে ৪৮ শতাংশ শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। তার মধ্যে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কারণ দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ফরেনসিক মেডিসিনে অধ্যাপক রয়েছেন মাত্র একজন। তিনি বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত। আর মৌলিক বিষয়গুলোর মধ্যে অধ্যাপক পদের ৭২.৭২ শতাংশ, সহযোগী অধ্যাপক পদের ৫১.৬৯ শতাংশ এবং সহকারী অধ্যাপক পদের ২৯ শতাংশ পদ শূন্য রয়েছে। মেডিক্যাল শিক্ষার আটটি মৌলিক বিষয় হলো অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, শারীরবৃত্ত, প্রাণরসায়ন, কমিউনিটি মেডিসিন, ওষুধবিজ্ঞান, চিকিৎসা আইন (ফরেনসিক), রোগবিদ্যা ও অণুজীববিজ্ঞান।

এদিকে শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকটের মধ্যেও সরকার ঠাকুরগাঁও ও নরসিংদীতে দুটি নতুন সরকারি মেডিক্যাল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে। ফলে দেশে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ৩৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া শেরপুর, লক্ষ্নীপুর, নাটোর, ভোলা, জয়পুরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ আরো কয়েকটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব মূল্যায়নাধীন রয়েছে। জয়পুরহাট ছাড়া বাকি সব প্রস্তাব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। বিগত ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার ২০টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাছাড়া ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে আরো এক হাজার ৩০টি আসন বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক, অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধা ছাড়াই আসন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৪টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ৩৫৫টি আসন কমিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে যুক্তি ছিল, শিক্ষার মান বজায় রাখতে শিক্ষার্থীসংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। বর্তমানে দেশে ৩৮টি সরকারি ও ৭২টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী ওসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক ডা. মো. মাছুদুর রহমান জানান, চিকিৎসকদের মধ্যে একাডেমিক পেশার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে। বেশির ভাগই ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে যেতে চান। আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত কোন বিষয়ে কত চিকিৎসক প্রয়োজন হবে সে বিষয়ে প্রজেকশন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তাছাড়া সাত হাজার চিকিৎসককে সুপারনিউমারি পদোন্নতি দেয়া হলেও অনেককে প্রয়োজনীয় স্থানে পদায়ন করা যাচ্ছে না। কারণ অনেকেই ঢাকার বাইরে যেতে অনাগ্রহী। অনেক মেডিক্যাল কলেজে আধুনিক সিমুলেশন টেবিল, উন্নত মাইক্রোস্কোপ, পোস্টমর্টেম সুবিধা কিংবা পর্যাপ্ত মৃতদেহের মতো মৌলিক শিক্ষাসামগ্রীরও ঘাটতি রয়েছে। ফলে হাতে-কলমে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন জানান, সরকার চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করছে। বর্তমানে ১৯টি ছাত্রাবাস নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। পুরনো মেডিক্যাল কলেজগুলোর অবকাঠামো সংস্কার এবং নতুন কলেজগুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আর শিক্ষক সংকট দূর করতে পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রণোদনা কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের মেডিক্যাল শিক্ষা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তবে সরকার পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। আশা করা যায় খুব শিগগিরই দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে