ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের বরাদ্দ অর্থের অর্ধেকই থাকছে অব্যয়িত

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৫ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের বরাদ্দ অর্থের অর্ধেকই থাকছে অব্যয়িত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের বরাদ্দ অর্থেকই থাকছে অব্যয়িত। এ ঘটনা ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই ঘটছে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬১টি গবেষণা কেন্দ্র থাকলেও তার উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যত নিষ্ক্রিয়। অনেক কেন্দ্রের নিজস্ব কার্যালয় বা পরিচালক নেই। আর অনেকগুলোর কার্যক্রম সীমাবদ্ধসেমিনার, কর্মশালা ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যেই। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার পরিবর্তে কিছু কেন্দ্র কেবল প্রশাসনিক অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। পাশাপাশি  অভিযোগ রয়েছে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায়ও কয়েকটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ গবেষণা কার্যক্রম বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ গবেষণা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং নীতিনির্ধারণে অবদান রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও গবেষণা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদন্ডের তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বরাদ্দের পরিমাণ সীমিত। তার মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রাপ্ত অর্থের পুরোটা ব্যয় করতে পারছে না। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তার প্রায় ৪০ শতাংশই অব্যয়িত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রগুলোর চিত্র ছিলো হতাশাজনক হতাশাজনক। কারণ গবেষণা কেন্দ্রগুলো গত পাঁচ অর্থবছরে বরাদ্দের ৬০ শতাংশেরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারেনি। 

সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি ৭ লাখ বরাদ্দ ছিলো। তার বিপরীতে ১২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে গবেষণা খাতে ৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা মোট বরাদ্দ থাকলেও খরচ হয়েছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয়ই করতে পারেনি। যা সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রকে দেয়া হয়। ওসব কেন্দ্র কোনো অর্থবছরই তাদের প্রাপ্ত বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় করতে পারেনি। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৩৮ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ১১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। ফলে ২৩ কোটি ১৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা অব্যয়িত থেকে গেছে। যা মোট বরাদ্দের ৬০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩টি গবেষণা কেন্দ্রের জন্য ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও। কিন্তু ২ কোটি ৬১ লাখ ২৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫২টি কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৭টি কেন্দ্রের জন্য ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৩ কোটি ৭০ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫৩টি কেন্দ্রের জন্য ৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৫টি কেন্দ্রের জন্য ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয় মাত্র ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে গবেষণা কেন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়নি প্রায় ৬০ টাকাই। তাছাড়া গত পাঁচ অর্থবছরে প্রতি বছরই ২০-২৫টি গবেষণা কেন্দ্র ব্যয় করেনি তাদের বরাদ্দকৃত অর্থের ১ টাকাও। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৩টি গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টিতে গবেষণা বরাদ্দের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। কিন্তু ওসব কেন্দ্রের জন্য ৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫২টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৬টিতে কোনো ব্যয় না হলেও ওসব কেন্দ্রের জন্য ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ২০টিতে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। ওই বছর ওসব কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তাছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০টি গবেষণা কেন্দ্র বরাদ্দের কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা। একইভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টিতে কোনো ব্যয় না হলেও ৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ভালো মানের গবেষক রয়েছেন। তারা গবেষণা করতে গিয়ে অনেক সময় অর্থের অভাবে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ ফেরত যাচ্ছে গবেষণা খাতের বরাদ্দের অর্থ। আর গবেষণা বরাদ্দ থেকে শিক্ষকদের সাধারণত যে অর্থ দেয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। অনেক ক্ষেত্রে ওই অর্থ দিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। যে কারণে অনেক শিক্ষক এ অনুদানের জন্য আবেদন করতে আগ্রহী হন না। আসলে এদেশে গবেষকদের সম্মান দেয়া হয় না। আরগবেষণার ক্ষেত্রে কম খরচ করলে ফলাফল ভালো আশা করা যায় না। গবেষণায় বরাদ্দ সীমিত হওয়ার পরও যে অর্থ দেয়া হয় অব্যয়িত থেকে যায় তার একটি বড় অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অগ্রগতি নিশ্চিতে আসলেই এতো গবেষণা কেন্দ্র আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা বিবেচনা করা দরকার।

অন্যদিকে গবেষণা কার্যক্রমে ব্যয়ের অর্থের স্বচ্ছতা ও মানও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ গবেষণা খাত থেকে শিক্ষকদের মধ্যে যারা অনুদান লাভ করেছে তাদের একাংশ নিয়ম অনুযায়ী দাখিল করছেন না তাদের কাজের প্রতিবেদন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুযায়ী, প্রতি অর্থবছর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষকদের গবেষণা প্রকল্পের জন্য যে অনুদান প্রদান করে, তার আওতায় সম্পন্ন গবেষণা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন এক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরে গবেষণা অনুদানপ্রাপ্ত ৯৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৫ জন নির্ধারিত সময়ে গবেষণা প্রতিবেদন জমা দিলেও বাকি ২১ জন এখনো দেননি। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অনুদানপ্রাপ্ত ৭৫ জন শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৩৮ জন তাদের গবেষণা জমা দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও অবশিষ্ট ৩৭ জন শিক্ষক এখনো তাদের গবেষণাপত্র বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেননি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসাইন জানান, গবেষণা তহবিল বরাদ্দের সময় এমন অনেক গবেষণা কেন্দ্রেও অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় যেগুলো কার্যত সক্রিয় নয়। ফলে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে থাকা গবেষণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৮-১০টি গবেষণা কেন্দ্র বন্ধের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যায়, ওসব কেন্দ্র বন্ধ হলে গবেষণা খাতের অর্থ আরো কার্যকর ও যথাযথভাবে বণ্টন করা সম্ভব হবে। আর গবেষণা খাতে বরাদ্দের অর্থ ব্যয়ের পর যে অংশ অবশিষ্ট থাকে তা সরকারি কোষাগারে জমা থাকে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম জানান, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত গবেষণা বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় একাই ব্যয় করে। ফলে বৈশ্বিক মানের গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য পরিবেশ, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা এবং স্থায়ী গবেষণা তহবিল ছাড়া কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।