বিপুল অর্থ খরচেও বাড়েনি দেশে ইলিশের উৎপাদন। বরং উল্টো কমেছে। মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ২২৯ কোটি টাকার ৬ বছরের প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। আর ওই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিলো ইলিশ উৎপাদন ৫৩ হাজার টন বাড়নো। পাশাপাশি বড় হবে মাছের আকার। তাতে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কমবে। জুনে ওই ৬ বছর মেয়াদের প্রকল্পটি শেষ হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বরং ৬ বছরে ইলিশের উৎপাদন ৬৭ হাজার টন কমেছে। পাশাপাশি আকার আরো ছোট হয়েছে। ৬ বছর আগে ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম। এখন তা ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম হয়েছে। জেলে এবং মৎস্য অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বঙ্গোপসাগরে ইলিশ সুরক্ষিত করতে না পারা ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণের ইলিশ উন্নয়নের ৬ বছরব্যাপী প্রকল্পের সুফল মেলেনি। তবে আহরণ সংখ্যার হিসাবে ইলিশ বাড়লেও আকার ছোট হওয়ায় ওজনের হিসাবে বার্ষিক উৎপাদন কমেছে। বিগত ২০২০ সালের ১ জুলাই শুরু হয়েছিল ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামের প্রকল্পটির যাত্রা। এখন ৬ বছর নিষ্ফল প্রকল্প পরিচালনার পর নতুন আরেকটি প্রকল্প হাতে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
সূত্র জানায়, ‘ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামের প্রকল্পের প্রথম দুই বছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন উৎপাদন বেড়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে প্রতিবছরই কমতে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল, যা ছিল মৎস্য অধিদপ্তরের ইতিহাসে বার্ষিক সর্বোচ্চ আহরণ। পরের বছরে ইলিশের আহরণ ৪২ হাজার টন কমে হয় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরো ২৯ হাজার টন কমে ৫ লাখ টনেনেমে আসে। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে ইলিশের আহরণ ৭১ হাজার টন কমে যায়। আর এখনো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আহরণের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে এবারও ইলিশ আহরণ ৫ লাখ টনের বেশি হবে না।
সূত্র আরো জানায়, ইলিশের পেটে ৮ থেকে ৯ মাস বয়সে প্রথমবার ডিম আসে। তখন সেটি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের হয়। দ্বিতীয় বছর যখন ডিম আসে, তখন ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের ইলিশে পরিণত হয়। ওই হিসাবে পরিপূর্ণ ইলিশ হতে দুই বছর সময় লাগে। তবে আহরণ অস্বাভাবিক বাড়ায় প্রথম বছর প্রজননের সময়েই জেলেদের জালে ধরা পড়ছে। যে কারণে বাজারে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম আকারের প্রচুর ইলিশ পাওয়া গেছে। তবে মোহনা-সংলগ্ন ইলিশের অভয়াশ্রমের নদীতীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করে সেখানকার পানি দূষিত করা হচ্ছে। যে কারণে অভয়াশ্রমে ইলিশ কমেছে। আর বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীর দূষিত পানি মিশে পদ্মা-মেঘনা ইলিশ বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। পাশাপাশি জেলেরা মোহনায় নিরবচ্ছিন্ন জাল পেতে ইলিশের যাতায়াতের পথ আটকে দিয়েছে। তাছাড়া ডুবোচর ও নাব্য সংকটে ইলিশের চলার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে জেলেদের মতে, তিন ধাপে নিধনে হারাতে যাচ্ছে ইলিশ। প্রথম ধাপে সূক্ষ্ণ জাল দিয়ে নিধন হয় একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা’ নামে বাজারে বিক্রি হয়। এ পর্যায় থেকে যেসব বাচ্চা রক্ষা পায় সেগুলো পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচারে ধরা হয়। তারপরও যেসব জাটকা বেঁচে সাগরের দিকে যেতে পারে, সেগুলোকে বড় ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ধরা পড়ছে। তাতে ইলিশ বেড়ে ওঠার সুযোগই পাচ্ছে না।
অন্যদিকে মৎস্য সম্পদ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদন কমার বিষয়টি উদ্বেগজনক। মূলত অতিরিক্ত আহরণ যেমন দায়ী, তেমনি মানবসৃষ্ট ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাও রয়েছে। ইলিশ কমার কারণ চিহ্নিত ও পরিস্থিতি উত্তরণে মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন। মূলত ইলিশের বাড়ি সাগরে। কিন্তু সাগরের ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না। ডুবোচর ও নাব্য সংকটও ইলিশ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার জন্য দায়ী। এর সমাধান করতে হলে সরকারের মেগা প্রকল্প নিতে হবে। নতুন প্রকল্প গৃহীত হলে সাগরে অভিযান চালানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদিও বর্তমানে আহরিত ইলিশের সংখ্যা গুনলে সেটি আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আকারে ছোট হওয়ায় ওজনের হিসাবে বার্ষিক আহরণ আগের চেয়ে কম।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ জানান, ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। ইলিশের জন্য নতুন আরেকটি প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলছে। প্রকল্পটি গৃহীত হলে কমপক্ষে এক বছর পর তার কার্যক্রম শুরু হবে।