চেলসির দলবদল কৌশলে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। এতদিন তরুণ প্রতিভা সংগ্রহের জন্য পরিচিত ক্লাবটি এবার ৩৫ বছর বয়সী ড্যানি ওয়েলবেক ও ৩৬ বছর বয়সী জর্ডান হেন্ডারসনের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের দলে নেওয়ার কথা ভাবছে। নতুন ম্যানেজার জাবি আলোনসোর অধীনে নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এমন পরিকল্পনা বলে মনে করা হচ্ছে। তবে একসঙ্গে আরও বেশি বয়সী খেলোয়াড় দলে নিলে চেলসির নতুন দলবদল নীতি নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গোল ডটকমের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রাইটন থেকে ওয়েলবেককে দলে নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে চেলসি। এর কিছুক্ষণ পরই হেন্ডারসনকে বিনা ট্রান্সফার ফিতে দলে আনার চেষ্টার খবর সামনে আসে। দুজনের বয়স ত্রিশের মাঝামাঝি। ফলে ২০২২ সালে ক্লাবটির মালিকানা নেওয়ার পর ব্লুকোর অধীনে যে তারুণ্যনির্ভর দলবদল নীতি দেখা গেছে, সেটি থেকে এটি বড় ধরনের পরিবর্তন।
চেলসির গত মৌসুম ছিল হতাশাজনক। ২০২৫-২৬ মৌসুমে লিগে দশম হয়ে শেষ করেছে তারা। এরপরই দলের মানসিক দৃঢ়তা, পরিণত মানসিকতা এবং প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের প্রমাণ করা খেলোয়াড় প্রয়োজন বলে আলোচনা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল এমন খেলোয়াড় আনা, যারা খুব বেশি সময় না নিয়ে দলকে তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য করতে পারবেন।
এতদিন চেলসির দলবদলের নীতির বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সম্ভাবনাময় তরুণদের দলে নেওয়া। তারা ভবিষ্যতে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে তারকা হয়ে উঠবেন, অথবা ভালো দামে বিক্রি করে ক্লাবকে বড় আর্থিক লাভ এনে দেবেন, এমন পরিকল্পনাই ছিল এর পেছনে। সেই জায়গা থেকে ৩৫ বছর বয়সী ওয়েলবেক ও ৩৬ বছর বয়সী হেন্ডারসনের দিকে নজর দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় পরিবর্তন।
২৬ বছর বয়সী ম্যাক্সেন্স ল্যাক্রোয়ার মতো খেলোয়াড়কে দলে নেওয়া এক বিষয়। কিন্তু মাঝ ত্রিশে থাকা ওয়েলবেক ও হেন্ডারসনের মতো দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে একই সময়ে দলে আনার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। দুজনই ২০১০ সালে সান্ডারল্যান্ডে সতীর্থ ছিলেন।
চেলসির সাম্প্রতিক দলবদল নীতির চিত্র বোঝাতে একটি পরিসংখ্যানও সামনে এসেছে। অপটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ৩৯ বছর বয়সী থিয়াগো সিলভার শেষ ম্যাচ খেলার পর থেকে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে চেলসির সর্বশেষ ১২৩ ম্যাচের কোনোটিতেই ৩০ বছরের বেশি বয়সী কোনো খেলোয়াড় এক মিনিটও মাঠে নামেননি।
এবার সেই ধারায় পরিবর্তন আনতে চান আলোনসো। ক্লাবের প্রধান কোচের বদলে ম্যানেজার হিসেবে নিজের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তিনি দলে অভিজ্ঞতা বাড়াতে চাইছেন। বিশ্বকাপ চলাকালে ৩৪ বছর বয়সী সান্ডারল্যান্ড অধিনায়ক গ্রানিত জাকার জন্যও চেলসি যোগাযোগ করেছিল, যদিও সেই চেষ্টা সফল হয়নি। ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার পর ৩২ বছর বয়সী জন স্টোনসও চেলসির নজরে ছিলেন। তবে তিনি এখন স্কুডেট্টো জয়ী ইন্টার মিলানে যোগ দিতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেন্ডারসনকে কেন চাইছে চেলসি
হেন্ডারসনকে দলে নেওয়ার পেছনে তার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। চেলসির তরুণ দলটিতে নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার ঘাটতি রয়েছে। দীর্ঘদিনের দলবদল নীতিতে শীর্ষ পর্যায়ের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ।
হেন্ডারসনের ইংল্যান্ড দলে ভূমিকা অবশ্য চেলসি সমর্থকদের কিছুটা আশ্বস্ত করতে পারে। ২০২৫ সালের মার্চে ইংল্যান্ডের দায়িত্ব নেওয়ার পর সাবেক লিভারপুল অধিনায়ককে আবার দলে ফেরান টমাস টুখেল। এরপর থেকে প্রতিটি ক্যাম্পেই হেন্ডারসনকে রাখা হয়েছে। মাঠের বাইরের অবদান ও নেতৃত্বের কারণে তাকে বাদ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপেও নিজের মানসিক দৃঢ়তার প্রমাণ দিয়েছেন হেন্ডারসন। মেক্সিকোর বিপক্ষে শেষ ষোলোর জয়ের পর এক দুর্ঘটনায় তার হাত ভেঙে যায়। এরপরও তিনি অনুশীলন চালিয়ে যান এবং খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখেন।
হেন্ডারসন সম্পর্কে টুখেলের মূল্যায়নও ছিল বেশ প্রশংসাসূচক। গত বছর ইংল্যান্ডের এই মিডফিল্ডারকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, “তিনি সবকিছুরই প্রতিমূর্তি। তিনি একজন ধারাবাহিক বিজয়ী, তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রও তাই। তিনি যে দলেই খেলেছেন, সেই দলের মূল ভিত্তি ছিলেন তিনিই, সেই ভিত্তি যা সবকিছুকে বিশেষ করে তোলে।”
টুখেল আরও বলেছিলেন, “তিনি প্রতিটি দলে যা নিয়ে আসেন তা হলো নেতৃত্ব, চরিত্র, ব্যক্তিত্ব এবং প্রাণশক্তি। তিনি নিশ্চিত করেন যেন সবাই সেই মানদণ্ড মেনে চলে।”
ইংল্যান্ডের সতীর্থদের কাছ থেকেও হেন্ডারসনের প্রশংসা এসেছে। বিশ্বকাপের সময় ইংল্যান্ডের ‘লায়ন্স ডেন’-এর একটি ভিডিও ক্লিপে চেলসির নতুন ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের খেলোয়াড় মরগান রজার্সকে হেন্ডারসনের দলে থাকা নিয়ে বিতর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে রজার্স বলেন, “যদি খেলোয়াড়রা আগে থেকেই ক্যাম্পে কাদের চাইবে তার একটি অন্ধ র্যাঙ্কিং করত, তাহলে সে সবার সেরা পাঁচজনের মধ্যে থাকত। সবারই।”
জুড বেলিংহ্যামও হেন্ডারসনের নেতৃত্বের গুণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “দলকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে তার কোনো অহংকার নেই। প্রতিদিন অনুশীলনে সে আরও ভালো করার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা করে, অন্যদেরও আরও ভালো করতে উৎসাহিত করে এবং অনুশীলনের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।”
এই বক্তব্যগুলোই দেখাচ্ছে, হেন্ডারসনকে শুধু একজন মিডফিল্ডার হিসেবে নয়, বরং ড্রেসিংরুমের নেতা হিসেবেই চেলসি বিবেচনা করছে।
ওয়েলবেকও শুধু অভিজ্ঞতার জন্য নন
ওয়েলবেকের ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টি আরও আলাদা। ৩৫ বছর বয়সেও ব্রাইটনের এই স্ট্রাইকার নিজের ১৮ বছরের প্রিমিয়ার লিগ ক্যারিয়ারের সেরা গোল করার মৌসুম পার করেছেন। গত মৌসুমে তিনি ১৩ গোল করেছেন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে করা গোলসংখ্যাটি ছিল তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
চেলসির গত মৌসুমের ব্যাকআপ নাম্বার নাইন লিয়াম ডেলাপের পারফরম্যান্সের সঙ্গে তুলনা করলে ওয়েলবেকের সাম্প্রতিক গোল করার সক্ষমতা আরও স্পষ্ট হয়। জোয়াও পেদ্রোর পেছনে থাকা ডেলাপ গত মৌসুমে মাত্র একটি গোল করেছিলেন।
ওয়েলবেককে দলে পেলে আলোনসোর হাতে এমন দুজন স্ট্রাইকার থাকবে, যারা দীর্ঘ সময় ধরে ইংলিশ শীর্ষ পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। আরেকটি বাড়তি সুবিধা হলো, ব্রাইটনের অ্যামেক্স স্টেডিয়ামে একসঙ্গে খেলার সময় জোয়াও পেদ্রো ও ওয়েলবেকের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল।
বয়স বাড়লেও ওয়েলবেকের শারীরিক সক্ষমতাও এখনও প্রিমিয়ার লিগের রক্ষণভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষ করে কোল পামার ও মরগান রজার্সের মতো সৃজনশীল খেলোয়াড়দের কাছ থেকে নিয়মিত বল পেলে তার শারীরিক সামর্থ্য কাজে লাগতে পারে।
ওয়েলবেকের বিপক্ষে চেলসির নিজেদের অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর নয়। প্রিমিয়ার লিগে চেলসির বিপক্ষে ১৯ ম্যাচে তিনি করেছেন নয় গোল এবং দুটি অ্যাসিস্ট। ২০১০ সালে সান্ডারল্যান্ডের হয়ে চেলসির বিপক্ষে প্রথম গোলটি করেছিলেন তিনি। চলতি বছরের এপ্রিলে এসেছে সর্বশেষ গোলটি।
শুধু গোল করার সামর্থ্য নয়, ড্রেসিংরুমেও ওয়েলবেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। মার্চে ব্রাইটনের কোচ ফ্যাবিয়ান হুরজিলার তার প্রধান স্ট্রাইকার সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি শুধু একজন গোলদাতা হিসেবেই আমাদের জন্য মূল্যবান নন, বরং মাঠের ভেতরে ও বাইরে একজন নেতা হিসেবেও।”
কতটা বদলাবে চেলসির দলবদল কৌশল?
ওয়েলবেক ও হেন্ডারসনকে নিয়ে চেলসির পরিকল্পনা সফল হলে ক্লাবটির দলবদল নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘদিন তরুণ খেলোয়াড়দের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার পর এবার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।
তবে ঝুঁকিটাও এখানেই। দুজনই ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে। ফলে তাদের মাঠের পারফরম্যান্স, শারীরিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বিশেষ করে চেলসি যদি আরও একাধিক অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে দলে নেয়, তাহলে তাদের নতুন দলবদল নীতিই সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
তবে ওয়েলবেক ও হেন্ডারসনকে আলাদা করে দেখার সুযোগও রয়েছে। একজন সাম্প্রতিক সময়ে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা গোল করার মৌসুম কাটিয়েছেন। অন্যজন ইংল্যান্ডের মতো দলের ড্রেসিংরুমে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই চেলসির এই পরিবর্তনকে নিছক বয়সের দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখার চেয়ে আলোনসোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই দুই অভিজ্ঞ খেলোয়াড় মাঠে ও মাঠের বাইরে দলকে কতটা বদলে দিতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কৌশলটি সাফল্য পাবে কি না।