সাদা পতাকা ঘিরে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১২ এএম
সাদা পতাকা ঘিরে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি

সাদা পতাকা ঘিরে দেশজুড়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে উড়তে দেখা গেছে রহস্যজনকভাবে আরবি লেখা সাদা পতাকা। আশঙ্কা করা হচ্ছে সাদা পতাকার আড়লে চরমপন্থী ও উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এমনকি এর পেছনে বিদেশী শক্তির ইন্ধনে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও থাকতে। সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে বিশেষ চিঠি দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরেও এ বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে বিগত সময়ে নিষিদ্ধ হওয়া বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনের খণ্ড খন্ড অংশ এই কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। তরুণদের মগজ ধোলাইয়ের এক নতুন কৌশল হিসেবে সামাজিক মাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ে উসকানি দিতে ব্যবহার করছে সাদা পতাকা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গ্রামীণ হাটবাজারসহ নানা স্থানে সাদা উড়তে দেখা গেছে। ইতিমধ্যে পুলিশ বিভিন্ন স্থান থেকে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ওসব ফুটেজে দেখা যায়, গভীর রাতে বা ভোরের আলো ফোটার আগে মোটরসাইকেলে করে এসে হেলমেট বা মাস্ক পরিহিত দুই-তিনজন যুবক দ্রুত পতাকাগুলো টানিয়ে চলে যায়। ইতিমধ্যে তাদের বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। তাদের মোবাইল গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মিলেছে উগ্রবাদী লিঙ্কের সন্ধানও। আর পতাকা টানানোর দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডে পাশাপাশি তার পেছনে অর্থায়ন, পরিকল্পনা এবং সাইবার স্পেসে উসকানিদাতাদের একটি বড় তালিকা ইতিমধ্যেই গোয়েন্দাদের কাছে এসেছে।

সূত্র জানায়,  ভুয়া আইডি ব্যবহার করে বেশ কিছুদিন ধরেই সুনির্দিষ্ট প্রচার চালানো হয়েছে টেলিগ্রাম, সিগন্যাল ও ফেসবুকে। ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে তারা তরুণদেরম গজ ধোলাইয়ের এবং হিজরতের আগ্রহী করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর  দেশ-বিদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা হুন্ডির মাধ্যমে এ কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থও আসছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে, গত ২৪ জুন বিভিন্ন স্থানে সাদা পতাকা টানানো হয়। কোথাও কোথাও র‌্যালি, বাইক শোডাউনও হয়েছে। ইতিমধ্যে পোস্টকারী ২৪টি ফেসবুক আইডি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। ওই দিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ায় কালিমার পতাকা হাতে র‌্যালি করে একদল যুবক। পরে ওই ছবি একটি ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করা হয়। একই দিন কে বা কারা যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারে কালিমার পতাকা লাগায়। আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তার টঙ্গী এলাকার ফ্লাইওভারের নিচেও ওই দিন পতাকা লাগানো হয়। ২২ জুলাই জামালপুরের ইসলামপুর ডিগ্রিরচর জামিয়া মফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে ডেফলা ব্রিজ পর্যন্ত পতাকার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। নাবাবগঞ্জে বাহ্রা বাজারে ‘আল খিদমাহ্ সেবা সংস্থা’র পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে লোকজনের হাতে পতাকা সংবলিত ছবি পোস্ট করা হয়। নরসিংদীর মাধবদীতে পতাকা নিয়ে মিছিল করার ছবি পোস্ট করা হয়। মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাটে কালিমার পতাকা খুলে নেয়ার সময় জনতার হাতে একজন আটকের ছবি একটি আইডিতে পোস্ট করা হয়।  আরেকটি আইডি থেকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুতে পতাকা স্থাপনের ছবি পোস্ট করা হয়।

সূত্র আরো জানায়, সাদা পতাকার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে জরুরি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাছাড়া ওই বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও ইউনিট প্রধানরা। বৈঠকে সাদা পতাকা টানানো নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বৈঠক থেকে যেকোনো মূল্যে সাদা পতাকা মিছিল বন্ধ করতে বলা হয়েছে। ওসবের সঙ্গে সম্পৃক্তদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২৪টি আইডি ব্লক করা হয়েছে। মূলত বিদেশি কিছু সংগঠন বাংলাদেশের কতিপয় লোকের সঙ্গে আঁতাত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিষয়ে মনিটরিং আরও জোরদার করতে বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে মিছিলের আড়ালে আকস্মিক নাশকতা সৃষ্টি করার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। সেক্ষেত্রে জনবহুল এলাকাগুলো টার্গেট করা হতে পারে। সেজন্য স্পর্শকাতর পয়েন্টগুলোতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর টহল ও নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। হামাস বা বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নামে সাদা পতাকা মিছিল কোনোভাবে মেনে নেয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এদিকে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি, ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারসহ অন্য কর্মকর্তাদের কাছ বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আকস্মিকভাবে সাদা পতাকা টানানোর ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। যেসব স্থানে ওসব পতাকা পাওয়া যাচ্ছে, তার চারপাশের নিরাপত্তা জোরদারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ইমামদের সঙ্গে সচেতনতামূলক বৈঠক করার কথা বলা হয়েছে। একই সাথে কোন গোষ্ঠী বা চক্র এর পেছনে রয়েছে তা দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। কারণ উগ্রবাদীরা সবসময় কৌশল পরিবর্তন করে। যখনই তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া হয়, তারা নতুন কিছু নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করে। সাদা পতাকা তেমনই একটি নতুন কৌশল হতে পারে বলে পুলিশ অনেকটা নিশ্চিত।

অন্যদিকে এ বিষয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সংবেদনশীল বিষয়কে কেন্দ্র করে উসকানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে যেন কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকেও তীক্ষ্ন নজর রাখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সাদা পতাকার বিষয়ে সরকার নজরে নিয়েছে। এটা সরকার খতিয়ে দেখছে। এটা নিয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গ্লোবালি ভুল বার্তা যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ ব্যাপারে সরকার সচেতন রয়েছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে। তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।