সবুজ মাঠের বুক চিরে নান্দনিক গ্রামীণ জনপদ

কালাই পৌরসভায় কাদা মাড়িয়ে চলার দিন শেষ

এফএনএস (মো: তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার; কালাই, জয়পুরহাট) :
| আপডেট: ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম | প্রকাশ: ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ০১:৫২ পিএম
কালাই পৌরসভায় কাদা মাড়িয়ে চলার দিন শেষ

এক সময় বর্ষা এলেই হাঁটুসমান কাদা-মাটি। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালি আর ভাঙাচোরা পথ। জরুরি প্রয়োজনে চলাচল ছিলো দুর্ভোগের আরেক নাম। কৃষককে মাথায় বা ভ্যানে করে ফসল আনতে হতো। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের পোশাকে লেগে থাকত কাদা-মাটির ছাপ। সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ শাসন আমলে, যে উন্নয়ন হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার আমলে জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকা এখন সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে চলে গেছে পেভিং ব্লক ও আরসিসি সড়ক। রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ সুপারি গাছ, সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিটলাইট, বসার বেঞ্চ আর চারদিকে বিস্তৃত কৃষিভূমি-সব মিলিয়ে এলাকাটি এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদেরও আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক কালে সরেজমিনে দেখা যায়, মূলগ্রাম ও সীতাহার-নয়াপাড়া এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ আরসিসি ও পেভিং ব্লক সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। মূলগ্রামের অভ্যন্তরে আরও প্রায় ৯০০ মিটার সড়কে বসানো হয়েছে পেভিং ব্লক। এ দুই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সড়কের দুই পাশে সারি সারি সুপারি গাছের পাতার মৃদু দোল, নির্দিষ্ট দূরত্বে সৌরচালিত স্ট্রিটলাইট এবং মাঝেমধ্যে বসার বেঞ্চ পুরো পরিবেশকে দিয়েছে নান্দনিক রূপ। সন্ধ্যার পরও সোলার লাইটের আলোয় নিরাপদে চলাচল করা যাচ্ছে। আর দূরে সবুজ ফসলের মাঠ তৈরি করেছে অন্য রকম এক আবহ। স্থানীয় কৃষক ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে পথটি এখন সকাল-বিকেলের হাঁটা ও অবকাশযাপনেরও প্রিয় ঠিকানা।

মূলগ্রাম এলাকার গৃহিণী আফরুজা, মাছুমা ও আমেনা বেগমসহ অনেকেই জানান, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় প্রতিদিন তাদের হাঁটতে হয়। আগে কাদা-মাটির কারণে হাঁটতে তাদের অনেক কষ্ট হতো। এখন সুপারি গাছে ঘেরা সতেজ পরিবেশে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। এত দ্রুত এত সুন্দর রাস্তা হবে, তাদের কখনো-তা কল্পনার বাইরে ছিলো।

সীতাহার-নয়াপাড়া সড়কে কথা হয় স্থানীয় আবু সাঈদ, আব্দুন নূর, নুরুন্নবীসহ ৭ জন কৃষক ও ৪ জন ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানাগেছে, এক সময় মোটা অংকের টাকা দিয়েও কোন ভ্যান বা অটো ভ্যান আমাদের গ্রাম মহল্লায় নিয়ে আসা যেত না দগদগে কাদার কারণে। এখন কৃষি পণ্য ক্রয়-বিক্রয়সহ দুরারোগ্য ও ডেলিভারি রোগী দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জন্য সহজেই ভ্যান, অটো ভ্যান, সিএনজি এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সচরাচর পাওয়া যায়। আগের দিনের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করলে এখনো মনে অসহায়ত্বের করুণ  ছবি ভেসে ওঠে। 

 মূলগ্রামের কৃষক সুলতান, মাছুদ, হেলাল ও শাহীনুর আরও জানান, আগে বর্ষায় জমি থেকে ধান বা সবজি বের করা ছিল চরম কষ্টের। এখন ট্রাক-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন মাঠের কাছাকাছি যেতে পারছে। এতে সময়, শ্রম ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার করিমনগর গ্রাম থেকে কালাই পৌরসভায় ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে এসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাবরিনা আক্তার শম্পা বলেন, সারি সারি সুপারি গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে খোলা মাঠের হাওয়া উপভোগ করা সত্যিই অসাধারণ। রাতে সোলার লাইটের আলোয় এই পরিবেশ আরও অনবদ্য রূপ নেবে।

কালাই পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গত এক বছরে পৌর এলাকায় প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও ৫ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। এসব উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন পৌরসভার ২৩ হাজার ৬৬৩ জন নাগরিক।

সূত্রটি আরও জানায়, জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন ও খাদ্যমন্ত্রী মো.আব্দুল বারীর এলাকায় উন্নয়নের স্বার্থে বিশেষ বরাদ্দে মহাসড়ক, মূলগ্রাম, সীতাহার, থুপসাড়া, আওড়া, সড়াইল, মুন্সীপাড়া, পাঁচশিরা এবং স্থানীয় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে মোট ৩৫টি ছোট-বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

থুপসাড়া সেলিমীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা মতিউর রহমান জানান, ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত আমাদের মাদ্রাসাটি শুধুমাত্র যোগাযোগ সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থেকেছে বছরের পর বছর। মাদ্রাসার দক্ষিণ দিয়ে জয়পুরহাট-মোকামতলা আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বের যে মাদ্রাসা সংলগ্ন যে রাস্তাটি যুক্ত হয়েছে-ওই রাস্তাটি বর্তমানে কালাই পৌরসভা আরসিসি কাজ শুরু করেছে। এছাড়াও রাস্তার দুই পাশে সুপারি গাছের চারা রোপন করছে। এতে রাস্তাটি দৃষ্টিনন্দন হচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা। কালাই উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নওশাদ জানান, কালাই পৌরসভা এলাকায় ফসলের জমি, বসতবাড়ি, রাস্তাঘাটসহ মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩১০ হেক্টর। এর মধ্যে ফসলি জমি প্রায় ৮১৫ হেক্টর।

কালাই সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. আব্দুল ওহাব সাখিদারের হিসাবে, পাকা সড়ক নির্মাণের ফলে কৃষকদের ফসল পরিবহনে প্রতি বিঘায় গড়ে অন্তত ১ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। ৮১৫ হেক্টর ফসলি জমি প্রায় ৬ হাজার ১১২ বিঘার সমান। ফলে প্রতি ফসলি মৌসুমে কৃষকদের পরিবহন ব্যয় কমছে আনুমানিক ৬১ লাখ টাকা। পৌরসভা এলাকার অধিকাংশ জমি তিন ফসলি হওয়ায় বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা-অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি টাকা।

শুধু পরিবহন ব্যয় কমানোতেই এর প্রভাব সীমাবদ্ধ নয়। পাকা সড়কের কারণে সড়কসংলগ্ন জমির দামও বেড়েছে বলে জানান আব্দুল ওহাব সাখিদার। তাঁর ভাষ্য, কিছুদিন আগেও যেসব জমির প্রতি শতকের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, পাকা সড়ক নির্মাণের পর সেসব জমির দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ কোনো কোনো এলাকায় জমির মূল্য প্রায় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

এবিষয়ে কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, “জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী মহোদয় একযোগে ৩৫টি কাজের উদ্বোধন করার পর আমরা টেকসই ও আধুনিক পরিকল্পনা গ্রহণ করি। আমাদের মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা সরেজমিনে প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করে দু’পাশে সুপারি গাছ, বসার বেঞ্চ ও সোলার লাইটের এই নান্দনিক মডেল দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এটিকে সারা দেশের পৌরসভার জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে প্রস্তাবের কথাও তিনি জানান।”

এই সুপারি গাছ বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “অন্যান্য বড় গাছ ফসলের আলো-বাতাসে বাধা সৃষ্টি করে জমির ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু সুপারি গাছ পরিবেশবান্ধব এবং ফসল বা জমির কোনো ক্ষতি করে না। বর্তমানে আমাদের রোপণ করা ২ হাজার ৫০০টি সুপারি গাছ রয়েছে। প্রতিটি গাছ বছরে দুই দফায় গড়ে ৬০০টি ফল দিলে এবং সর্বনিম্ন ৫ টাকা দরে বিক্রি হলেও প্রতি বছর সুপারি বিক্রি থেকেই পৌরসভার ফান্ডে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বাড়তি রাজস্ব যোগ হবে। এটি কোনো কল্পনা নয়, বাস্তব হিসাব।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে কালাই পৌরসভার নতুন প্রকল্পগুলোতেও একই ধরনের টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও অর্থকরী মডেল অনুসরণ করা হবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে কৃষি অর্থনীতির বিকাশ, জমির মূল্য বৃদ্ধি এবং নান্দনিক পরিবেশ-সব মিলিয়ে কালাই পৌরসভার গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে