শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেল ভাবছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম | প্রকাশ: ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেল ভাবছে সরকার : শিক্ষামন্ত্রী

শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাক্রমে খেলাধুলা যুক্ত করা, সব উপজেলায় মিডডে মিল চালু, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল এবং শিক্ষক সংকট কাটাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে ‘রিটায়ার্ড টিচার্স পুল’ গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ঢাকার গুলশানের হোটেল লেকশোরে ‘খেলায় খেলায় শিখি’ তথ্যপুস্তক পর্যালোচনা বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে সরকার স্কুল ড্রেস ও মিডডে মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। আগামীতে দেশের সব উপজেলা এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলাকে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করা হবে। ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজও চলছে। পাশাপাশি ২০২৮ সাল থেকে প্রথম শ্রেণির কারিকুলামে খেলাধুলা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশীয় খেলাগুলোর প্রসারের ওপরও গুরুত্ব দেন শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর মতে, খেলাধুলার মধ্য দিয়ে শিশুদের শেখার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করা সম্ভব।

ইভটিজিংয়ের মতো অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে শিশুদের দূরে রাখতে তাদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর ভাষায়, খেলাধুলার সময় মাঠ পরিষ্কার রাখা ও শৃঙ্খলা মেনে চলার মতো বিষয়গুলোও শিশুদের শেখানো হবে। এর মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের গুণ তৈরি হবে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত না থাকলে তিনি বর্তমান অবস্থানে আসতে পারতেন না। খেলাধুলা তাঁকে নেতৃত্বের গুণ অর্জনে সহায়তা করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৮ সালের কারিকুলামের জন্য আগামী সপ্তাহে একটি কমিটি গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এর অংশ হিসেবেই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘খেলায় খেলায় শিখি’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, সরকার একটি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এ জন্য জায়গা নির্বাচন নিয়েও ভাবা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকায় জায়গার সংকট রয়েছে, তাই পূর্বাচলে বিশ্ববিদ্যালয়টি করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

নৈতিকতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও কারিকুলামে বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শিক্ষকদের স্বতন্ত্র পে-স্কেলের ভাবনা

শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষকদের বেতন অন্য কোনো পেশার সঙ্গে তুলনা করে নির্ধারণ করা উচিত নয়। জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদার জায়গা থেকে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার ভাবছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রস্তাব আসায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

মন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের জন্য এমন একটি স্বতন্ত্র পে-স্কেল করা যেতে পারে, যা অন্য কোনো পেশার সঙ্গে তুলনীয় হবে না। তিনি বলেন, “শিক্ষকদের পে-স্কেল আলাদা হওয়া উচিত। অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে এটা করা উচিত নয়। কম হোক, বেশি হোক, শিক্ষকদের সঙ্গে কারও তুলনা চলে না।”

শিক্ষকদের মর্যাদার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জাতীয় সংসদে একজন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের করা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনসংক্রান্ত তুলনার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের তুলনা শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শিক্ষকদের জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শুধু বেতন-ভাতা নয়, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শিক্ষকেরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করেন। তাই অন্য কোনো পেশার সঙ্গে তুলনা না করে তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদার জায়গা থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষক সংকট কাটাতে অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে পুল

শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক প্রয়োজন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকসহ বিভিন্ন পদ শূন্য রয়েছে।

২০১৭ সাল থেকে এ-সংক্রান্ত মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, “প্রতিষ্ঠান এভাবে চলতে পারে না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। শিক্ষক নিয়োগ কত দ্রুত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছি।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট নিরসনে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে ‘রিটায়ার্ড টিচার্স পুল’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

এ ছাড়া দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য কারিগরি শিক্ষা ও জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন শিক্ষামন্ত্রী।

আনন্দময় শিক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিশুদের এমন আনন্দময় শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তাদের শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলার মাঠ বাড়ানো এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকাশে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদের সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে