পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নে রূপবান শিমের ফুলে ফুলে ভরে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। যেদিকে তাকানো যায় শুধু শিম ফুলের দৃশ্যই চোখে পড়ে। এরমধ্যে শিমের নতুন জাত রুপভান বাজারে আসতে শুরু করেছে। ফুল বাছাই আর গাছের পরিচর্যায় মহাব্যস্ত ঈশ্বরদীর শিম চাষিরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে ঈশ্বরদীর মুলাডুলির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। শিম চাষকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে বিশাল সবজির আড়ৎ ও সমিতি। এই বাজার থেকেই উৎপাদিত শিম প্রতিদিন ট্রাকে লোড হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায়। এরমধ্যে কিছু আগাম জাতের লাগানো রুপভান, অটো ও সাদা জাতের শিম বাজারে আসতে শুরু করেছে। আগাম জাতের হওয়ায় প্রতি কেজি শিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
শীতকালীন সবজি হলেও ঈশ্বরদীতে আগাম জাতের শিম চাষে ফলন প্রাপ্তি শুরু হয়েছে। আসছে শীত তাই দেশের প্রধান শিম উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে এখন চলছে শিম চাষের জোর প্রস্তুতি। কৃষকরা এখন মহাব্যস্ত। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে ঈশ্বরদীসহ পার্শ্ববর্তী প্রায় ২৫ গ্রামের মানুষ শিম চাষের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। শীতকালীন সবজি হলেও শিম চাষের উপযুক্ত সময় হওয়ায় ঈশ্বরদীর প্রায় ৩ হাজার শিম চাষী এখন তাদের নিজ জমি ও খাজনা করা জমিতে রোপন করা শিম চাষের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এখন মুলাডুলির যেদিকে তাকানো যায় শুধু শিম ফুলের সমারোহ চোখে পড়ে।
ঈশ্বরদীতে এবার চলতি মৌসুমে প্রায় ১৬’শ হেক্টর জমিতে শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলে তারা ধারণা করছেন। কৃষি বিভাগ আরও জানিয়েছে গত মৌসুমে ঈশ্বরদীতে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ করা হয়েছিল। স্তশিম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঈশ্বরদীর শিম চাষিরা একটি মাল্টিপারপাস কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
ঈশ্বরদীতে শিম চাষের সাথে প্রায় ১১ হাজার পরিবার সরাসরি জড়িত। শিম চাষের কারণে শত শত বেকার যুবক এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। মুলাডুলির বিভিন্ন গ্রামে কয়েক বছর আগেও যেখানে পাকা বাড়ি-ঘর তেমন একটা খুঁজে পাওয়া যেত না, সেই মুলাডুলিতেই শিম চাষ করে পাকা ঘর-বাড়ি তৈরী করছেন। মুলাডুলি ছাড়াও ফরিদপুর, আটঘরিয়া, শেখপাড়া, রামনাথপুর, রাজাপুর, হাজারী পাড়া, পারখিদিরপুর, কচুয়ারামপুর, দুবলাচরা, প্রতিরাজপুর, গোপালপুর, আড়কান্দি ও মাঝগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এখন শিম চাষে জড়িত।
এসব এলাকার ৯৫ ভাগ জমিতে শিম চাষ হওয়ার কারণে মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে দেশের শিম বিপণনের প্রধান কেন্দ্র। শিম উৎপাদনের সময় এই মুলাডুলি থেকে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ ট্রাক শিম রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। ক্রেতা বিক্রেতার পদভারে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখরিত থাকে মুলাডুলির শিম বাজার। মৌসুমে প্রতিদিন কোটি টাকার সিম এই বাজার থেকে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক।
মুলাডুলির অন্যতম বড় শিম চাষী আমিনুর রহমান (শিম বাবু) জানান, প্রতি বিঘা জমিতে শিম চাষে খরচ হয় ৪ হাজার টাকা। মাত্র তিন মাসের এই ফসল প্রতি বিঘায় বিক্রি হয় ৩০ হাজার টাকায়। বর্তমানে শিম চাষের পুরো মৌসুম চলছে। নতুন জাত রুপভান ও অটো নামের শিম বাজারে উঠতে শুরু করেছে। আগাম আবাদের কারণে রুপবান ও অটো নামের এই শিম বাজারে ব্যাপক চাহিদা এবং দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৪০-৫০ মন শিম বাজারে আসছে। আগামী এক মাসের মধ্যে ব্যাপক ভাবে এই শিম বাজারজাত করা হবে।
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন জানান, এবার চলতি মৌসুমে প্রায় ১৬’শ হেক্টর জমিতে শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষকরা এখন মাচা ও ফুল বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতোমধ্যে আগাম জাতের কিছু নতুন শিম বাজারে আসতে শুরু করেছে। কৃষকরা দামও পাচ্ছেন ভালো। কৃষি বিভাগ শিম চাষীদের সার্বিক সহযোগিতা করছে। তিনি গতবারের চেয়ে এবছর ফলন ভালো হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।