নীলফামারীর সৈয়দপুরে সুদের ব্যবসার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে,শহরের বিভিন্ন এলাকায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে সুদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কিছু কর্মচারীও রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ বসতভিটা ও সম্পদ হারিয়ে পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সুদ কারবারির কাছ থেকে টাকা নিতে গেলে অনেক সময় গ্রহীতার কাছ থেকে ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এবং স্বাক্ষর করা ব্ল্যাঙ্ক চেক নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা পরিশোধ করতে না পারলে ওই চেকে ইচ্ছামতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা করার ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ফলে ঋণের সামান্য টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে অনেককে দীর্ঘদিন ধরে সুদের বোঝা টানতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি হাজার টাকায় মাসে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত সুদ নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বছরে সুদের পরিমাণ মূল টাকার বড় একটি অংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র, নিম্নআয়ের মানুষ এবং আকস্মিকভাবে অর্থের প্রয়োজন হওয়া ব্যক্তিরাই মূলত এসব অনানুষ্ঠানিক ঋণের প্রধান গ্রাহক।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শহরের বিভিন্ন মহল্লায় গোপনে এসব কারবার পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করেও কতিপয় ব্যক্তি সুদের ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সচেতন মহলের অভিযোগ, সরকারি কোনো অনুমোদন বা বৈধ লাইসেন্স ছাড়া এভাবে সুদের ব্যবসা পরিচালনা করা হলে তা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাঙ্ক চেক নেওয়ার অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। কারণ, এসব নথি পরবর্তীতে অপব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষকে আইনি ও আর্থিক জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
সৈয়দপুরের কয়েকজন সচেতন নাগরিক বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে মানুষ টাকা ধার নিলেও চড়া সুদের কারণে শেষ পর্যন্ত সেই ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় সুদের টাকা বাড়তে বাড়তে মূল টাকার কয়েকগুণ হয়ে যায়। তখন অনেক পরিবার তাদের জমি-জমা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়। তাদের মতে, শহরে কারা সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, কীভাবে টাকা লেনদেন হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কেউ প্রতারণা বা হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না-তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাঙ্ক চেক গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত দাবি করেছেন তারা।
সচেতন মহল বলছে, অনুমোদনহীন সুদের কারবার বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ গ্রহণ ও আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় সহজ শর্তে ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে আরও বহু পরিবার সুদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে এক ভুক্তভোগী বলেন,আমি কিছু টাকা রেলওয়ে কারখানার এক লোকের কাছ থেকে নিয়েছি। মুল টাকার তিনগুন পরিশোধ করলেও তিনি আসল টাকা ছাড়ছেন না। এখন আমি চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছি। সুদের টাকা পরিশোধ করতে পারছি না। সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের আর এক কর্মচারী বলেন,আমি বাজারের এক লোকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেই। সুদে আসলে তাকে প্রায় দুই লাখ টাকা দিয়েছি। তবুও আমার স্বক্ষরকরা চেক ফেরত দিচ্ছেন না।
আর এক নারী বলেন,আমি কয়েক ভরি স্বর্ণ এক দোকানদারকে দিয়ে চার লাখ টাকা নেই। মাসে মাসে সুদের অংশ পরিশোধ করেছি। বর্তমানে সুদে আসলে হয়েছে সাড়ে সাত লক্ষ টাকা। কিছু টাকা ছাড় দিয়ে স্বর্ণ ফেরত চাচ্ছি কিন্তু কোন কথাই মানতে রাজি নন ওই সুদারু। এখন আমি দিশেহারা হয়ে পড়েছি। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। মনে হয় আমার স্বর্ণ আর ফেরত পাব না। সুদে খেয়ে নেবে আমার স্বর্ণ।