নানা উদ্যোগেও দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না। বরং দিন দিন সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় বেড়েই চলেছে আহত ও নিহতের সংখ্যা। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন খাতে অন্তত ১০টি আইন, নীতি ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অগ্রাধিকারের পরিবর্তন ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে কার্যকর হয়নি ওসব উদ্যোগ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই তিন চাকার অবৈধ যানবাহন অবাধে চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা না কমার পেছনে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান, সমন্বয়, নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতিতে তা সফল হচ্ছে না। সড়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা ও প্রচার জোরদারে বিগত ২০১৬ সালে সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ গঠন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ বিভিন্ন সময় স্বল্পমেয়াদি ট্রাফিক সপ্তাহ, সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ, চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিআরটিএ বিগত ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ৬ অর্থবছরে বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা বিভাগ সচেতনতামূলক প্রচারে ব্যয় করেছে ১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। কিন্তু উন্নতি ঘটেনি সড়ক দুর্ঘটনার পরিস্থিতি। অথচ সরকার সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গত এক দশকে আইন, বিধিমালা, নানামুখী কার্যক্রম মিলিয়ে একগুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু সব উদ্যোগকে ব্যর্থ করে প্রতিদিনই সড়কে প্রাণ ঝরছে।
সূত্র জানায়, রাজধানীর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিগত ২০১৮ সালে দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। তার জেরে সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। ওই আন্দোলনের ফলেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ সালে পাস হয়। ১৯৮৩ সালের পুরোনো মোটরযান অধ্যাদেশের পরিবর্তে নতুন আইন আনা হয়। আর নতুন আইনে বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত গাড়ি চালনা, লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেসসহ বিভিন্ন বিষয়ে শাস্তির বিধান রাখা হয়। আর সরকার জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা হালনাগাদ করে দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত সময়ে ওই লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ফলে পরবর্তী পর্যায়ে সময়সীমা ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তারপর সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের জন্য প্রণয়ন করা হয় সড়ক পরিবহন বিধিমালা-২০২২। তাতে ১২টি অধ্যায়, ১৬৭টি বিধান, ৯টি তফসিল ও ৪৪টি ফরম রয়েছে। যাতে চালকের লাইসেন্স, কন্ডাক্টর ও সুপারভাইজারের লাইসেন্সসহ বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়।
সূত্র আরো জানায়, সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিগত ২০২৩ সালে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট শুরু হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় উচ্চ ঝুঁকির মহাসড়ক, শহর ও জেলা সড়কে প্রকৌশলগত নিরাপত্তাব্যবস্থা, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারী সুবিধা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সড়ক-মহাসড়কে পরিবহন খাতে শক্তিশালী মালিক ও শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। তারা কঠোর আইন প্রয়োগ বা পুরোনো গাড়ি সরানো, চালকের যোগ্যতা যাচাই কিংবা রুট ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে গেলেই চাপ তৈরি হয়। মূলত পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের চাপের মুখেই ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ থমকে রয়েছে। চালকের বেপরোয়া গতি, ওভারটেকিং, ক্লান্তি ও দক্ষতার ঘাটতি সড়কে দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য করা যায়নি চালকের প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা ও লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা। বরং পুরোনো, ত্রুটিপূর্ণ ও অনিরাপদ যানবাহন সড়কে চলাচল বন্ধ করার জন্য ফিটনেস ব্যবস্থা থাকলেও আদতে তার বাস্তবায়ন নেই।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সড়ক-মহাসড়কে তিন চাকার ধীরগতির যানবাহন অবাধে চলাচল করছে। ওসব যানবানের বিরুদ্ধে কোনো নেয়া হয় না। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের যান দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে একই সড়কে চলাচল করায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কারণ মহাসড়কে ওসব যান হঠাৎ থেমে যাওয়া, ইউটার্ন নেয়া কিংবা পাশ কাটানোর সময় দুর্ঘটনায় পড়ে।
অন্যদিকে সড়ক নিরাপত্তায় সরকারি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয় নেই। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে, বিআরটিএ চালক ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে, পুলিশ আইন প্রয়োগ করে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা দেয়। তাছাড়া নগর এলাকায় সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সংস্থাও ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ওসব সংস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানান, দেশের সড়কের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালনার তদারকি সব ক্ষেত্রেই বিশৃঙ্খলা। মহাসড়কে লোকাল গাড়ি ও পথচারী আসার কথা নয়। শ্রেণিবিন্যাসের দিক থেকে স্থানীয় রাস্তা, মধ্যম পর্যায়ের রাস্তা, প্রধান সড়ক; তার পরে মহাসড়ক। মহাসড়ক কোনো এলাকাকে রাজধানীর সঙ্গে অথবা বন্দরনগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং এর মান হবে সর্বোচ্চ পর্যায়ের। আর ওই মান আসে ব্যবহারকারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা দিয়ে। মহাসড়ক সব ব্যবহারকারী সমগতির হলে সড়কের ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু এদেশে যত্রতত্র মহাসড়কে যে কেউ ঢুকে পড়ে। যা পরিকল্পনার বিশৃঙ্খলা।