সিসা দূষণ বন্ধের দাবিতে রাজশাহীতে স্মারকলিপি

এম এম মামুন; রাজশাহী
| আপডেট: ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম | প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
সিসা দূষণ বন্ধের দাবিতে রাজশাহীতে স্মারকলিপি
রাজশাহীর প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবৈধভাবে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি ও রিসাইক্লিন বন্ধের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) বরেন্দ্র অঞ্চলের যুব, পরিবেশবাদী, সেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের বৃহৎ ঐক্য বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও গ্রিন কোয়ালিশন এর পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল দুপুর ২টায় রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলাম এর কাছে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে অবৈধভাবে সিসা (Lead) তৈরি ও রিসাইক্লিং করা হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ব্যাটারি পোড়ানোর সময় তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধযুক্ত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। ফলে পরিবেশ দূষণ ও মারাত্বক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। বাতাসে সিসার ক্ষুদ্রকণা মিশে যাওয়ায় মানুষের শরীরে সিসার মাত্রা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এতে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, কিডনি জটিলতা, রক্তশূন্যতা এবং ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়াও মাটি, পানি ও বাতাস দূষিত হয়। নষ্ট হয় ফসলি জমি এবং মারা যায় গবাদি পশু ও প্রাণবৈচিত্র্য।ইউনিসেফ ‘দ্য টক্সিক ট্রুথ: চিলড্রেনস এক্সপোজার পলিউশন আন্ডারমিন্স এ জেনারেশন অব পোটেনশিয়াল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে প্রতি তিন শিশুর একজন বা প্রায় ৮০ কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তারও বেশি। এ শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বসবাস দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে আনুমানিক ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার। এতে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। সিসার বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ শিশু। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর ভেতর বাংলাদেশ চতুর্থ।স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, রাজশাহীর পবা উপজেলার বিমানবন্দর সড়কে ফায়ার সার্ভিসের পাশের রাস্তার একটু সামনে “এইট স্টার মেটাল” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বাউন্ডারির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ ব্যাটারি পোড়ানোর কারবার। এখানে রাতের আধারে পুরনো ব্যাটারি পোড়ানো হয় এবং সিসা সংগ্রহ করা হয়। অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা পোড়ানোর ফলে রাজশাহীর পরিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতি, কৃষিজমি ও জনস্বাস্থ্য মারাত্বক হুমকির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিবেশ আইন ও নীতিমালাগুলো অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে এ ধরনের কারখানা পরিচালিত হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়।স্মারকলিপিতে রাজশাহীসহ সারাদেশে অবৈধভাবে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি ও রিসাইক্লিন বন্ধে ৫ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিসমূহ হলো- পবাসহ রাজশাহীর সব এলাকায় রাতের আধারে চলা অবৈধভাবে ব্যাটারি পোড়ানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে; লোকালয় এবং ফসলি জমির পাশে গড়ে ওঠা সব অবৈধ কারখানা স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করতে হবে; পরিবেশ ছাড়পত্র ও লাইসেন্স ছাড়া সিসা পোড়ানোর অপরাধে জড়িত মালিকদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; রাজশাহীর প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নজরদারি বাড়াতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা  করতে হবে। বিশেষত সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত এরকম এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে; সিসা দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এলাকায় এলাকায় মাইকিং ও সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করতে হবে। এ কাজে স্থানীয় তরুণ, যুব ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহকে যুক্ত করতে হবে।এছাড়াও পৃথক স্মারকলিপি রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী, পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপ-পরিচালক মোছা: তাছমিনা খাতুন এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার পবা মো. ইবনুল আবেদীন বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। এসময় উপস্থিত ছিলেন, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক পলি রানী, আমার বাংলা তরুন সংঘের সভাপতি তাহমিদ জাকি, স্বচ্ছলতা এসোসিয়েশন এর সভাপতি ইহতেশামুল আলম জোহা, গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর সদস্য মিরাতুজ জাহান মিলি, রাকিব হাসান বাপ্পি, সুমাইয়া খাতুনসহ প্রমূখ।স্মারকলিপি প্রদানের সময় জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাৎকালে রাজশাহীর প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিসা দূষণ বন্ধে উল্লিখিত ৫ দফা দাবিসহ রাজশাহীর পুকুর-দিঘি, জলাশয়-জলাধারগুলো সুরক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে