‘দেখতে দেখতে মোর বাড়ি-ভিটা নদীত চলি গেল। এল্যা কোনঠে গিয়া দাড়াম ছাওয়া-পোয়া নিয়া’-হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই বিলাপ করছিলেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি গ্রামের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম(৪৮)। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
সাইদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘গরু-ছাগল নিয়া মহাবিপদে আছি। কোনঠে গিয়া রাখমো, তা আল্লাহই জানে। চোখের সামনে নিজের বাড়িঘর নদীত চলি গেল। এখন ছাওয়া-পোয়া নিয়া কই থাকমো, কী খামো-কিছুই বুঝতেছি না।’
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরি গ্রামের তিস্তা নদীতীরবর্তী এলাকায় হঠাৎ করেই তীব্র ভাঙন শুরু হয়। ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাইদুল ইসলামের বসতভিটার একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে তার বসতঘরসহ প্রয়োজনীয় স্থাপনা ও ব্যবহার্য সামগ্রী নদীতে চলে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম, দুলাল মিয়া ও আকবর আলীসহ কয়েকজন জানান, বিকেলের দিকে নদীর তীরে হঠাৎ ভাঙন দেখা দেয়। প্রথমে ভাঙন তুলনামূলক কম থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর স্রোতের টানে তীরের মাটি ধসে পড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে সাইদুল ইসলামের বসতভিটা ভাঙনের কবলে পড়ে। স্থানীয়রা চোখের সামনে তার বাড়িঘর নদীতে বিলীন হতে দেখেন।
তারা বলেন, তিস্তা নদীর স্রোত বর্তমানে খুবই প্রবল। ভাঙন শুরু হওয়ার পরপরই স্থানীয়রা নিজেদের মতো করে বাড়িঘরের মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাঙনের গতি এত দ্রুত ছিল যে, অনেক কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় নদীতীরবর্তী অন্যান্য পরিবারগুলোর মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
ভাঙনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পেয়ে পাউবোর এসডিও (সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার) মাহমুদুল হাসান দ্রুত ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেন।
এ সময় তিনি ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক কাজ শুরুর আশ্বাস দেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রামহরি গ্রামের আরও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, রামহরি গ্রামের নদীতীরবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা নদীর ভাঙন নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে। হঠাৎ করে নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বিশেষ করে গবাদিপশু রাখার জায়গা ও বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় অনেক পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘হঠাৎ ভাঙন দেখা দেওয়ার খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত ভাঙনরোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’