ব্যবসার পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
ব্যবসার পরিবেশে দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নানামুখী সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো দৃশ্যমান সুফল এখনো মেলেনি। বিগত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালের অস্থিরতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও ব্যবসায়ীদের আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া এবং ব্যবসার খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড হ্রাসসহ বেশকিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে দেশে নতুন করে দেখা দেওয়া তীব্র জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট পুরো শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের প্রধান বাণিজ্যিক শহরগুলোতে ঘন ঘন লোডশেডিং এবং মিল-কারখানায় গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে নতুন করে ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা সরকারের ব্যবসায়িক সংস্কার উদ্যোগগুলোকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। জানা যায়, শিল্প খাত ও উৎপাদনমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ চালাতে পারছে না। এর ফলে সার্বিক শিল্প উৎপাদনে প্রায় ৩০ শতাংশ পতন ঘটেছে এবং কারখানাগুলো তাদের মোট সক্ষমতার গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। উদ্যোক্তারা কারখানা চালাতে বিকল্প উপায়ে অতিরিক্ত খরচ করে গাড়িতে করে গ্যাস এনে কাজ চালানোর চেষ্টা করলেও সার্বিক উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকট কাটাতে সরকার ডি-রেগুলেশন বা নিয়মকানুন সহজীকরণের জন্য টাস্কফোর্স গঠন এবং অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) সংশোধনসহ বেশকিছু ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নের সুফল পেতে ব্যবসায়ীদের আরও অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর সময় অপেক্ষা করতে হবে। সূত্র মতে, দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত দীর্ঘদিন ধরেই বহুমাত্রিক সংকটে জর্জরিত, যার কারণে অসংখ্য কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক আলোচনায় তথ্য প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচামালের সংকট ও পরিচালনা ব্যয়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে দেশের অন্তত ৫০টি টেক্সটাইল মিল তাদের উৎপাদন কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মব ভায়োলেন্স বা বিশৃঙ্খলা অনেকটা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও চাঁদা আদায়ের নতুন ধরণ, বেচাকেনা মন্দা এবং রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের নতুন সিদ্ধান্তে খুচরা ও পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা মারাত্মক উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশে নতুন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির কোনো লক্ষণ নেই বলে স্পষ্ট মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতা ও চেম্বার প্রতিনিধিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে নতুন কোনো বড় বিনিয়োগের চিন্তা করা প্রায় অবাস্তব, বরং চালু থাকা বিদ্যমান ব্যবসা-বাণিজ্যগুলোকে টিকিয়ে রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতৃবৃন্দ বলছেন, সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছেন তা নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও বৈশ্বিক মন্দা ও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় বাজার অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা কিছুটা কাটলেও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ব্যবসা পরিচালনাসংক্রান্ত যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দূর না হওয়া পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগকারীরা বাজারে অর্থ লগ্নির ব্যাপারে স্পষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে নীতিগত সংস্কার ও সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বাজেটে রপ্তানিমুখী ও আমদানি প্রতিস্থাপক শিল্পকে সহায়তা দেওয়া, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সহজ করা এবং সরকারি লজিস্টিকস পলিসি বাস্তবায়নের মতো দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সরাসরি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকে বসে তাদের সমস্যার কথা শুনছেন এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, যা অতীতে খুব একটা দেখা যেত না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিগত সংস্কার ও প্রশংসনীয় পরিকল্পনা সত্ত্বেও দেশের মূল অর্থনৈতিক সূচক যেমন— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এখন পর্যন্ত বড় কোনো গতি ফেরেনি। সরকার ও অর্থনৈতিক গবেষকদের সম্মিলিত অভিমত হলো, টেকসই বাণিজ্যিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অবকাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এসব উদ্যোগের প্রকৃত প্রতিফলন পাওয়া সম্ভব হবে না।