দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সিনথেটিক মাদকের চাহিদা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২০ এএম
দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সিনথেটিক মাদকের চাহিদা

দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সিনথেটিক মাদকের চাহিদা। তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে শক্তিশালী ও ভয়ঙ্কর নতুন সিনথেটিক মাদক। ফলে দিন দিন ওই মাদকের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে প্রচলিত মাদক ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের জায়গা দখল করছে ল্যাবরেটরিতে তৈরি সিনথেটিক মাদক। নানা পথে বিগত ২০১৮ সাল থেকে দেশে সিনথেটিক মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে। আর ওসব নতুন মাদক ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে ডাকযোগে আকাশপথে পার্সেল হিসেবে দেশে ঢুকছে। মানুষের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে দেয় সিনথেটিক মাদক। ফলে কমে যায় মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তার ক্ষমতা। আসক্তদের মধ্যে দেখা দেয় তীব্র মানসিক বিভ্রান্তি, অবাস্তব জিনিস দেখা এবং অহেতুক সন্দেহ। এমনকি তীব্র হতাশা এবং আত্মহত্যার প্রবণতাও সৃষ্টি করে। তাছাড়া  দীর্ঘ মেয়াদে সিনথেটিক মাদক গ্রহণে লিভার সিরোসিস এবং কিডনিও সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ে। শক্তিশালী রাসায়নিক উপাদানে তৈরি ওসব মাদকে শরীরের প্রধান অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো হঠাৎ অকেজোও হয়ে যেতে পারে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বর্তমানে যেসব সিনথেটিক মাদকের প্রসার ঘটছে তার মধ্যে রয়েছে খাত, আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এমডিএমএ, এলএসডি, টাপেন্টাডল, ট্রামাডল, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম, ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হোরাইন, ব­্যাক কোকেন ও এমডিএমবি। ল্যাবে তৈরি ওসব সিনথেটিক মাদক দ্রুত আসক্তি তৈরি করে। যে কারণে দেশে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সিনথেটিক নেশায় আসক্তের সংখ্যা। সিনথেটিক মাদক পরিবহন অনেকটা সহজ এবং আর্থিকভাবে দ্রুত লাভবান হওয়া যায় বলে দেশেও এর দ্রুত প্রসার ঘটছে। আর অল্প পরিমাণ মাদক দিয়েই বৃহৎ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। 

সূত্র জানায়, দেশে সিনথেটিক মাদকের বিস্তারে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস যোগ করেছে নতুন মাত্রা। তাছাড়া ডার্ক ওয়েব, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সিনথেটিক মাদকের বাজার। আর ল্যাবে তৈরি নতুন নতুন সিনথেটিক মাদক শিডিউলভুক্ত না হওয়ায় পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করাও কিছুটা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। মাদক কারবারিরা মূলত দেশের উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েদের মাঝে সিনথেটিক মাদক ছড়িয়ে দিতেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। সিনথেটিক মাদক মস্তিষ্ক ও শরীরে দ্রুত গভীর ক্ষতি করে। আর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে দেখা দিতে পারে মানসিক বিকার, স্মৃতিভ্রংশ, শারীরিক অবক্ষয় ও প্রাণঘাতী জটিলতা। অবশ্য ওসব মাদকের চালান ধরতে প্রচলিত অভিযানের পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস, অনলাইনে লেনদেন ও সন্দেহভাজন নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ করে ধরা হচ্ছে ওসব মাদক। 

সূত্র আরো জানায়, সিনথেটিক মাদক খাত হলো পূর্ব আফ্রিকা ও আরব অঞ্চলের একটি ভেষজ উদ্ভিদ। ওই উদ্ভিদের কাঁচা পাতা ও ডাল চিবিয়ে রস পান করা হয়। আইস বা ক্রিস্টাল মেথ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভয়ংকর রাসায়নিক মাদক। দেখতে অনেকটা কাচের টুকরা বা স্বচ্ছ ক্রিস্টালের মতো। আইস মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত উত্তেজিত করে এবং হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, তীব্র অনিদ্রা, ক্ষুধা মন্দা, দ্রুত ওজন হ্রাস, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা হ্যালুসিনেশন তৈরি হয়। মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে অবৈধ ল্যাবরেটরিতে তৈরি হচ্ছে ওই মাদক। এমডিএমএ হলো মেথালাইন ডিঅক্সি মেথাএমফিটামিন, যা মূলত একটি কৃত্রিম বা সিনথেটিক ও অত্যন্ত শক্তিশালী ক্ষতিকারক মাদক। এ মাদকটি মূলত পশ্চিম ইউরোপের অবৈধ ল্যাবরেটরিগুলোতে তৈরি করা হয়। তাছাড়া এলএসডি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ল্যাবরেটরিতে তৈরি রাসায়নিক ও সাইকেডেলিক মাদক। যা সেবনের পর মানুষের মস্তিষ্ক তার আশপাশের বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং তীব্র হ্যালুসিনেশন বা অলীক বিভ্রমে আক্রান্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের গোপন ল্যাবগুলোতে তৈরি হয় ওই মাদক। টাপেন্টাডল হলো একটি শক্তিশালী সিনথেটিক মাদক। হেরোইন বা ইয়াবার বিকল্প মাদক হিসেবে তা ব্যবহৃত হয়। ট্রামাডল হলো শক্তিশালী ব্যথানাশক ওষুধ। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে শরীরে খিঁচুনি ও মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রভাব ফলে। তাতে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ও শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যেতে পারে। আর ডিএমটি বা ডাইমিথাইলট্রিপ্টামাইন হলো একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হ্যালুসিনোজেনিক বা দৃষ্টিভ্রমকারী সাইকেডেলিক মাদক। ম্যাজিক মাশরুম হচ্ছে এক ধরনের সাইকেডেলিক বা বিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদক। তাতে সিলোসাইবিন এবং সিলোসিন নামক সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান থাকে। ওই উপাদানগুলো মানুষের তীব্র হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব অনুভূতির সৃষ্টি করে। চরম উত্তেজনা, পেটে অস্বস্তি, আনন্দ বা হঠাৎ করে তীব্র ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়, হৃদস্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং অতিরিক্ত ঘাম হয়। তাছাড়া ডিওবি, কুশ, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জমাট হোরাইন, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ অত্যন্ত বিপজ্জনক মাদক। ওসব মাদক ভারত, আফগানিস্তান, মিয়ানমার, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, পেরু এবং বলিভিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গোপন গবেষণাগারে তৈরি হয়।

এদিকে গত ১৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উচ্চমূল্যের ৪ হাজার ১৮০ গ্রাম কুশ জব্দ করে। তাছাড়া ২২ আগস্ট কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদী থেকে ৩ কেজি ক্রিস্টাল মেথসহ মিয়ানমারের এক নাগরিককে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে ওই মাদক জব্দ করা হয়। দেশে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন মাদক এমডিএমবি এর চালান জব্দ করা হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রথমবারের মতো ধরা পড়ে ব্ল্যাক কোকেন নামে নতুন মাদক। ২০২১ সালের নভেম্বরে খুলনায় উদ্ধার করা হয় ভয়াবহ ডিওবি (ডাইমিথোক্সিবোমো এমফিটামিন) মাদক। যা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পোল্যান্ড থেকে এসেছিল। সেটিও দেশে প্রথম শনাক্ত হয়। আর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর জিগাতলায় প্রথমবারের মতো আইস উদ্ধার করা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে প্রথমবারের মতো এলএসডি উদ্ধার হয়।

অন্যদিকে সিনথেটিক মাদক প্রসঙ্গে ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম জানান, তরুণ সমাজের মধ্যে নতুন সিনথেটিক মাদক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ডিএনসি শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে সর্বত্র কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে। তাছাড়া নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নতুন কোনো মাদক পেলেই তা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হচ্ছে। তাতে সিনথেটিক মাদক প্রমাণিত হলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে