প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘদিন ধরে চলছিল ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির অভিযোগ। কৃষিজমির মধ্যে গড়ে ওঠা এসব কারখানা থেকে ছড়াচ্ছিল কালো ধোঁয়া ও ঝাঁঝালো গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছিল কার্যক্রম। কিন্তু এতদিনেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি নিয়ে।
অবশেষে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘এফএনএস’ এ সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের রায়েরগ্রাম-নিঘোরকান্দা এলাকার হারবা বিলে কথিত অবৈধ সীসা তৈরির কারখানায় অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে অভিযানের আগেই কারখানার প্রায় অর্ধশত শ্রমিক পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক বা জরিমানা করা সম্ভব হয়নি।
সংবাদ প্রকাশের পরই অভিযান
গত শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘এফএনএস’ পত্রিকায় ‘ত্রিশালে ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে সীসা, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদে হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা ও বৈলর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকায় কৃষিজমির মধ্যে ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির অভিযোগ, বিষাক্ত ধোঁয়া ও ঝাঁঝালো গন্ধে পরিবেশ দূষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এর তিন দিনের মাথায় সোমবার সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়।
অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুর রহমান।
মিলেছে সীসা তৈরির সরঞ্জাম
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, অভিযানে ঘটনাস্থলে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়। পরে সেগুলো আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। জব্দ করা সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে ব্লোয়ার, গরম সীসা নাড়ানোর চামচ, খুন্তি, ব্যাটারির কেসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।
আদালতের উপস্থিতি টের পেয়ে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরা পালিয়ে যায়। ফলে কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনাস্থল থেকে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়েরের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অভিযানে পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক এবং ত্রিশাল থানা পুলিশের একটি দল সহযোগিতা করে।
‘এতদিন তাহলে দেখেনি কে?’
স্থানীয়দের প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে যদি কৃষিজমির মধ্যে পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ কার্যক্রম চলে থাকে, তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত মনিটরিং কোথায় ছিল?
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিঘোরকান্দা ও নামাপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির কার্যক্রম চলছে। এসব কারখানার কারণে আশপাশের এলাকায় কালো ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি কৃষিজমি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কারখানাগুলোর পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা নিয়েও যথাযথভাবে তদারকি করা হয়নি। তাদের প্রশ্ন, সংবাদ প্রকাশের পর যদি প্রশাসন দ্রুত অভিযান চালাতে পারে, তাহলে এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিদর্শনে এসব কারখানা কেন শনাক্ত হয়নি?
জমি দেওয়ার অভিযোগ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে
হরিরামপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, নিঘোরকান্দা ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনোয়ারুল হক নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের জমি ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির কারখানার জন্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও কোনো কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আনোয়ারুল ইসলামও অপকটে স্বীকার করেন যে, ওই জমিগুলো তাঁর এবং তাদের পরিবারের সদস্যদেরই। যা সিসা তৈরীর কারখানাকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সিসা তৈরীর কারখানার কোন ট্রেড লাইসেন্স আছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন তা নেই এবং এ কারখানারও কোন বৈধতা নেই।
অভিযানেই কি শেষ হবে?
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অভিযান শেষে জব্দ করা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া বা অন্যত্র কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আবারও একই কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তাই শুধু সরঞ্জাম জব্দ নয়, কারখানার প্রকৃত মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর মতো কার্যক্রম পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত নজরদারি জরুরি।
স্থানীয়দের জোরালো প্রশ্ন:
দীর্ঘদিন ধরে কারখানা চললেও নজরে পড়েনি কেন? পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত পরিদর্শন হয়েছিল কি? কারখানার পরিবেশগত ছাড়পত্র ছিল কি না? জড়িত প্রকৃত মালিকদের শনাক্ত করা হবে কি? অভিযান শেষে আবারও কারখানা চালু হলে দায় নেবে কে?
এখন দেখার বিষয়, ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই অভিযান শুধু সাময়িক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রশাসন তদন্ত করে দীর্ঘদিনের এ কার্যক্রমের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে স্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্যোগ নেয়।